রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফিরবে কবে!

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

২৩ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত গাম্বিয়ার করা মামলায় রোহিঙ্গাদের ওপর চলা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করে অন্তর্বর্তীকালীন রায় দিয়েছে। রায়ে মিয়ানমারকে রাখাইনে অবস্থানরত ছয় লাখ রোহিঙ্গার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বুদ্ধিস্ট সন্ত্রাসীরা কোনো ধরনের গণহত্যা চালাতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া গণহত্যার তথ্যাদি সংরক্ষণ ও প্রতি চার মাস অন্তর কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এই রায় মিয়ানমার মানতে বাধ্য কিন্তু না মানলে আদালতের পক্ষে কিছু করার সুযোগ নেই। রায়ের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মিয়ানমারকে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিতে চাইলে স্থায়ী সদস্য চীন ও অস্থায়ী সদস্য ফিলিপাইনের আপত্তিতে সেটা আটকে যায়। এতদিন রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করলেও এখন তা চীনে এসে ঠেকেছে। নিরাপত্তা কাউন্সিল বিবৃতি দিতে অসম্মত হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে নিতে আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এসব আমাদের কূটনৈতিক বিজয়। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যেখানে এসে থেমেছে, চীনকে বোঝাতে পারলে এবং রোহিঙ্গাদের পক্ষে আসা আন্তর্জাতিক সমর্থন যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে দেওয়া রায়টি যুগান্তকারী। এই রায়ে আদালতের ১৭ জন বিচারক সর্বসম্মতভাবে রায় দিয়েছেন। এই বিচারকার্য শেষ হতে কয়েক বছর সময় লাগার কথা। কিন্তু জাতিসংঘের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির গণহত্যার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়াকে আমলে নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন রায় দিয়েছে আদালত। এই রায়ে আদালত গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। ফলে মিয়ানমারের কপালে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার কলঙ্ক লেগে গেল। এছাড়া যেসব দেশ এত দিন মিয়ানমারকে অন্ধ সমর্থন করে আসছিল চীন, রাশিয়া, ভারত ও জাপান; এই দেশগুলোর নৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ল। এই রায়ে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ উচ্চারিত হয়েছে ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন’। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অন্যতম বিরোধ রোহিঙ্গা হিসাবে জাতিতাত্ত্বিক স্বীকৃতি না দেওয়া। এই রায়ের ফলে রোহিঙ্গাদের জাতিতাত্ত্বিক স্বীকৃতি মিলল। ফলে এই রায় আন্তর্জাতিক ডকুমেন্ট হিসেবে নিয়ে বিশ্বশক্তিদের সঙ্গে দেনদরবার করতে পারলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথ সুগম হবে। ইতোমধ্যে আদালতে কানাডা, নেদারল্যান্ড রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ যেসব দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন দিচ্ছে তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। চীন ও ভারত আমাদের নিকটতম বন্ধু। মিয়ানমারের অন্যতম বিনিয়োগকারী দেশ জাপান আমাদের উন্নয়নের অংশীদার। ফলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আদালতের রায় ও বাংলাদেশের সংকটের কথা তাদের তুলে ধরে দরকষাকষি করতে হবে।

চীন ঝুঁকিপূর্ণ মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প স্থল রাস্তা নির্মাণ করতে চায় মিয়ানমারের ওপর দিয়ে। ইতোমধ্যে রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর ও চীন হতে রাখাইন হয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক ও জাতিতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চল কোনোভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যরুটের জন্য নিরাপদ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে আমলে নিয়ে বন্ধুরাষ্ট্র চীনকে এসব বিষয়ে অবহিত করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান কল্পে রাজি করানো যেতে পারে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, চীন ও ভারতের বাণিজ্যের সম্ভানাকে প্রসারিত করতে দ্রুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জরুরি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়