বইমেলা জাতির মননের উত্সব স্বকৃত নোমান

একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে বইমেলা এখন আমার কাছে প্রধান উত্সব। এ কথা সত্যি যে, মেলায় বই প্রকাশিত হবে, সেজন্য লিখি না। লিখি প্রাণের তাগিদে। কিন্তু এই কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই, আমার নতুন সব কটি বই প্রকাশিত হয় মেলাকে কেন্দ্র করেই। ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশ থেকে পাঠকেরা আসেন। প্রিয় লেখকের প্রিয় বইগুলো সংগ্রহ করেন। আমার একটি বই সারা বছর যা বিক্রি হয়, তার অন্তত পাঁচ গুণ বেশি বিক্রি হয় মেলার সময়। এই একটি মাস আমি লিখি না, পড়িও না।   চেষ্টা করি মেলাটিকে উপভোগ করতে। লেখক-প্রকাশকদের সঙ্গে দেখা হয়, পাঠকদের সঙ্গে দেখা হয়। দেখা এবং আড্ডা আমার খুব ভালো লাগে।

বইমেলা এলে কেউ কেউ দাবি তোলেন, মেলায় প্রবেশের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা হোক। তাদের যুক্তি, টিকিট সিস্টেম চালু হলে মেলায় ‘উটকো লোকজন’ যাবে না। এই উটকো লোকজন কারা? যারা বই কেনেন না, যারা শুধু ঘুরতে যান, যারা শুধু ফুচকা-চটপটি খেতে যান এবং যারা সেলফি তুলতে যান। টিকিট সিস্টেম চালু হলে এদের ‘উত্পাত’ কমবে, প্রকৃত পাঠকরা আরামসে বই কিনতে পারবে।

আচ্ছা, বইমেলাটা কি শুধুই বই কেনা-বেচার জন্য? মোটেই তা নয়। এর নাম কিন্তু মেলা। মেলায় মানুষ শুধু কেনা-বেচা করতে যায় না। মেলায় মানুষ যেমন কলা বেচতে যায়, তেমনি রথও দেখতে যায়। মেলায় মানুষ ঘুরতে যায়, আনন্দ করতে যায়। যেমন বৈশাখী মেলা। বৈশাখী মেলায় গিয়ে কাউকে জিনিসপত্র কিনতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বৈশাখী মেলায় প্রবেশের জন্য কেউ কি টিকিট সিস্টেম চালুর দাবি তোলে? তোলে না। বইমেলাও তেমনি একটি উত্সব। বইমেলা শুধু বই কেনা-বেচার উত্সব নয়, এটি একটি জাতীয় উত্সবের রূপ পেয়েছে। এই উত্সবে পাঠকরা যেমন অংশ নেবে, অপাঠকরাও নেবে। এই অংশ নেওয়াটা ইতিবাচক। অংশ নিতে নিতেই অপাঠকরা একদিন পাঠকে রূপান্তরিত হবে।

বই মানুষ কেন পড়ে? বেঁচে থাকার জন্য? বেঁচে থাকার জন্য বই পড়ার কোনো দরকার নেই। মানুষ বই পড়ে সাহিত্যরস আস্বাদনের জন্য। বইপাঠ একটা আনন্দও। বই কিনবেও মানুষ আনন্দের সঙ্গে। আমি তো এমন বই বিক্রয় কেন্দ্রের স্বপ্ন দেখি, যেখানে বসে মানুষ চা খাবে, কফি খাবে, আড্ডা দেবে, মন চাইলে বসে বসে বই পড়বে, ফেরার সময় পছন্দের বইগুলো কিনে নিয়ে যাবে। বইমেলাও তেমনি। মানুষ ঘুরবে, চা খাবে, চটপটি-ফুচকা খাবে, আড্ডা মারবে, মন চাইলে বই কিনবে, মন না চাইলে কিনবে না। আমরা যখন দাবি তুলছি, তোমাকে বই কিনতেই হবে, না কিনলে মেলায় ঢোকা যাবে না, তখন আমরা বইমেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের উত্সবকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। এটা এক ধরনের জবরদস্তি। শিল্প-সাহিত্য কোনো জবরদস্তির ব্যাপার নয়। উত্সবের ব্যাপার, আনন্দের ব্যাপার।—লেখক : কথাসাহিত্যিক