পূজা রাণী কর্মকার
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, অন্য প্লাস্টিকের তুলনায় বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক অধিক সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। পৃথিবীতে ব্যবহূত প্লাস্টিকের মধ্যে ১৫ শতাংশেরও কম পরিমাণ প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে ব্যবহূত হয়। বাকি ৮৫ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয় এবং তা এক সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় ভূগর্ভে। না পচে থেকে যায় দীর্ঘকাল। এগুলো তখন মাটির অভ্যন্তরে ফসল উত্পাদন ও বৃক্ষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন গ্যাস চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ফলে ফসল উত্পাদনে ব্যাঘাত ঘটে। নালা-নর্দমাকে বন্ধ করে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে প্লাস্টিকের মোড়ক ও পাত্রে রাখা খাদ্যসামগ্রী গ্রহণের ফলে নানা ধরনের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্লাস্টিকসামগ্রীর এত ক্ষতিকর দিক থাকা সত্ত্বেও এবং কঠোর আইন করেও এর উত্পাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না। বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক হতে পারে এই সমস্যার সঠিক সমাধান। যা আমাদের পরিবেশ এবং অর্থনীতি—দুটোকে মজবুত এবং টেকসই করবে। এই প্লাস্টিক খুব সহজেই পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাবে, ফলে মাটি বা পানি কোনোটাই দূষিত হবে না। পরিবেশ রক্ষার জন্য বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আধুনিক এই সময়ে আমরা যতটা সম্ভব টেকসই আর সহজ জীবনযাপন করতে চাই। দামে সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে প্লাস্টিকের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। তাই চাইলেও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব না বলেই ভাবতে পারি আমরা; কিন্তু এভাবেই প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়িয়ে পরিবেশ বিপর্যয় করছি আমি আপনি—সবাই। তাই আসুন সচেতন হই। ভবিষ্যত্ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে কমাই প্লাস্টিকের ব্যবহার। যতটা সম্ভব বায়ো-ডিগ্রেডেবল পণ্যের ব্যবহার বাড়াই।
বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক হচ্ছে বায়ো-প্লাস্টিক সমন্বিত, যা নবায়নযোগ্য কাঁচামাল থেকে তৈরি। বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক হলো প্লাস্টিক যা প্রাকৃতিকভাবে পচে যায়। পরিবেশের অণুজীবগুলো বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের কাঠামো ভেঙে ফেলে, ফলে এগুলো পচে যায় এবং ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টিকের তুলনায় পরিবেশের পক্ষে কম ক্ষতিকারক। এটি মাটির সঙ্গে সহজেই মিশে যায় এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকগুলো প্রাকৃতিক উদ্ভিদসামগ্রী থেকে তৈরি করা হয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কর্ন, কমলার খোসা, স্টার্চ এবং গাছপালা। সাধারণ প্লাস্টিকগুলো রাসায়নিক ফিলার দিয়ে তৈরি করা হয় যা গলানোর সময় পরিবেশের ক্ষতি করে; কিন্তু বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক তৈরির সময় প্রাকৃতিক উত্স থেকে এমন একটি পদার্থ পাওয়া যায়, যা এই রাসায়নিক ফিলারগুলো ধারণ করে না এবং পরিবেশের জন্য ঝুঁকিও বহন করে না। এই বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক তৈরির সমস্ত উপকরণকে ভালোভাবে গলিয়ে বিভিন্ন আকারের প্লাস্টিকের পানির বোতল এবং বাসনের ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হয়। এই ভাবেই তৈরি করা হয় বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক পণ্য।
এই ধরনের প্লাস্টিক সাধারণত প্যাকেজিং, ক্রোকারি, কাটলেট এবং খাদ্য পরিষেবা পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য অনেক ভালো, কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি পুনরুদ্ধার করার সময় কোনো ক্ষতি হয় না। এছাড়াও এই প্রক্রিয়াটিতে খুব কম গ্রিনহাউজ গ্যাস এবং ক্ষতিকারক কার্বন নিঃসারণ হয়। বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক উত্পাদনের জন্য কম শক্তি প্রয়োজন হয়, যা নন-বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এর মানে একই পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে দ্বিগুণ পরিমাণে বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং ব্যাগ তৈরি সম্ভব। বায়োপণ্য পুনর্ব্যবহার করা সহজ, বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকগুলো এমন উপাদান থেকে তৈরি হয় যা সম্পূর্ণ বায়ো-ডিগ্রেডেবল। বায়ো-প্লাস্টিক বিষাক্ত নয়, ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টিকগুলো ক্ষতিকারক বাই-প্রোডাক্ট ও রাসায়নিক দ্বারা পরিপূর্ণ, যা ভেঙে যাওয়ার সময় প্রকাশিত হয়। বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোনো রাসায়নিক পদার্থ নেই।
বর্তমানে পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত বস্তু যেমন বাঁশ, তন্তু প্রভৃতিকে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বায়ো-প্লাস্টিকে পরিবর্তিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে যা হবে সুলভ এবং ব্যাবহারিক প্রয়োজনীয়তাযুক্ত। আশা করা যায়—এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তি অধিগ্রহণের ফলে জৈব বা বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ক্রমশই বৃদ্ধি পাবে। আর আমরা আগামীর সবুজ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারব আরো দ্রুত, এই নতুন জৈব প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়