ইত্তেফাক-এর সাড়ে ছয় দশকের গৌরবময় পথচলা

জন্মলগ্নেই দেশে ‘গণতন্ত্র ও আজাদী’ প্রতিষ্ঠাকেই ব্রত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিল ইত্তেফাক। দৈনিকটির প্রথম সংখ্যার প্রথম সম্পাদকীয়তে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হইয়াছিল, ‘দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হইল। সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে আমাদের যে ক্ষুদ্র উদ্যম এই দেশের অগণিত মানুষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবিতে মুখর হইয়া উঠিয়াছিল আজ উহারই দৈনিক সংস্করণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও আজাদী সংগ্রামের নিশান-বরদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করিল।’ ইহার পর ৬৫ বত্সর পার হইয়া গিয়াছে, ৬৬ বত্সরে পা রাখিয়াছে ইত্তেফাক। দীর্ঘ এই পথযাত্রায় অর্জনের চুলচেরা হিসাব যদি আমরা নাও করি, শুধু এই ভূখণ্ডের বাংলা ভাষার একটি সংবাদপত্র হিসাবে ইত্তেফাক-এর সাড়ে ছয় দশকের এই অবিচ্ছিন্ন পথ চলাও কোনো অংশে কম গৌরবের নহে। আজ আমরা আনন্দের সহিত বলিতে পারি যে, পরাধীন দেশে যে লক্ষ্য লইয়া পত্রিকাটির যাত্রা শুরু হইয়াছিল তাহা অর্জিত হইয়াছে। বিস্তর বাধা আসিয়াছে। স্বৈরশাসকের রোষানলে পড়িয়া একাধিকবার পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ভস্মীভূত হইয়াছে মেশিন ও আসবাবপত্রসহ ইত্তেফাক কার্যালয়। সর্বোপরি, পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে উপর্যুপরি কারাবরণ করিতে হইয়াছে। কিন্তু ইত্তেফাক কখনোই তাহার অভীষ্ট লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত হয় নাই। পিছপা হয় নাই স্বাধীনতাপরবর্তীকালের নূতন প্রেক্ষাপটে নূতনতর চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায়।

দৈনিক ইত্তেফাক-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর। তবে ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক হিসাবে ইত্তেফাক-এর পথচলা যখন শুরু হয় তখনই পূর্ববঙ্গবাসীর আশাভঙ্গের বেদনা শুরু হইয়া গিয়াছে। তোড়জোড় শুরু হইয়াছে তাহার মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারটিও ছিনাইয়া লইবার। প্রত্যাশিত গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার দূরে থাক, পাকিস্তান নামক সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটির নাগরিক হিসাবে প্রাপ্য মর্যাদাটুকুও জুটিতেছে না তাহাদের ভাগ্যে। জন্মলগ্নেই ইত্তেফাক এই অধিকারবঞ্চিত জনগণের পক্ষাবলম্বন করিয়াছিল। আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ও বিপদসঙ্কুল পথযাত্রায় ইত্তেফাক পরিণত হইয়াছিল স্বাধীনতাকামী মানুষের অকুতোভয় কণ্ঠস্বরে। বস্তুত বিগত সাড়ে ছয় দশকে এদেশের মানুষের যাহা কিছু বৃহত্ ও মহত্ অর্জন— তাহা হইতে ইত্তেফাককে পৃথক করা সম্ভব নহে। কারণ আওয়ামী লীগের বিকাশ, যুক্তফন্ট্রের অভূতপূর্ব বিজয় ও ছয়দফার জয়জয়কার হইতে শুরু করিয়া বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে মিশিয়া আছে ইত্তেফাক-এর নিরাপস ভূমিকা ও অসামান্য অবদান। বলা আবশ্যক যে, একদিকে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ক্ষুরধার কলম, অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের অব্যাহত অনুপ্রেরণাই ছিল ইত্তেফাকের মূল পাথেয়। ইত্তেফাক কখনোই এই আদর্শের রজ্জু হাতছাড়া করে নাই।

মুক্তিকামী জনগণের পক্ষাবলম্বনের কারণে চরম মূল্যও দিতে হইয়াছে ইত্তেফাক-এর সহিত সংশ্লিষ্ট সকলকে। বিশেষ করিয়া পত্রিকাটির কাণ্ডারি মানিক মিয়াকে অপরিসীম যাতনা ভোগ এবং বিপুল ত্যাগ স্বীকার করিতে হইয়াছে। বলা বাহুল্য, কোনো অর্থসম্পদ কিংবা ঐশ্বর্যের জন্য নহে, তাঁহারা ত্যাগ স্বীকার করিয়াছিলেন মহত্ একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য। সেই লক্ষ্য অর্জিত হইয়াছে। সুযোগ সৃষ্টি হইয়াছে এই অর্জনকে কাজে লাগাইয়া জনগণের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করার। স্বাধীনতা অর্জনের তুলনায় ইহা কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ নহে। বলা অনাবশ্যক যে, পরাধীন আমলের রাজনীতি আর পরাধীনতা-উত্তরকালের রাজনীতি কখনোই এক হইতে পারে না। কথাগুলি ইত্তেফাক-এর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। অনিবার্যভাবে পরাধীন আমলের ইত্তেফাক আর এখনকার ইত্তেফাক-এর ভূমিকা ও বক্তব্য ভিন্ন হইতে বাধ্য। যে-চ্যালেঞ্জকে সম্মুখে রাখিয়া ইত্তেফাক তাহার যাত্রা শুরু করিয়াছিল, সেই চ্যালেঞ্জে আমরা জয়ী হইয়াছি। এখন ইত্তেফাক নূতন একটি চ্যালেঞ্জকে শিরোধার্য করিয়াছে। সেইটি হইল স্বাধীনতার স্বপ্নকে সফল করার চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইত্তেফাক সফল হইতে পারিবে কিনা— তাহা দেখিবার জন্য আমাদের অপেক্ষা করিতে হইবে। ইত্তেফাক-এর প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অনন্য নেতৃত্বের শূন্যতা কতখানি পূরণ হইবে— তাহা প্রশ্নসাপেক্ষ হইলেও ইহা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তাঁহার অনুসৃত আদর্শ হইতে ইত্তেফাক কখনোই বিচ্যুত হইবে না।

অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরিয়া যাহারা ইত্তেফাককে অব্যাহতভাবে সহায়তা, সমর্থন ও প্রেরণা জোগাইয়া চলিয়াছেন, এই সুযোগে তাহাদের সকলের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাই।