ইত্তেফাক ও মানিক মিয়া

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত ইত্তেফাক পত্রিকার জন্য। ইত্তেফাক আজো আছে। তবে মানিক মিয়া সম্পাদিত ইত্তেফাকের রূপ ও প্রকৃতি ভিন্ন ছিল। কালের প্রকৃতিও তখন ভিন্ন ছিল। সময়ের দাবি পূরণে আর ইতিহাসের গতিনির্ধারণে সংবাদপত্র হিসেবে ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানকালে পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক বাঙালি সংস্কৃতির ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কার্যকর। ছয় দফা আন্দোলনের বিকাশে আর শেখ মুজিবুর রহমানের অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভের ও বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনেও ইত্তেফাকের ভূমিকা অপরিসীম। ছয় দফা আন্দোলনকালে আন্দোলনের প্রয়োজনে মানিক মিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাপ্তাহিক The Dacca Times। ইত্তেফাকের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনে মানিক মিয়াকে পথ চলতে হয়েছিল নির্যাতন মোকাবিলা করে। তিনি কারারুদ্ধ হয়েছেন, পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে, পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বঞ্চনার পর বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে উদ্দেশ্যনিষ্ঠায় অটল থেকে মানিক মিয়া এগিয়ে গেছেন। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পথ সৃষ্টিতে মানিক মিয়ার ভূমিকা অবশ্য স্মরণীয়। তিনি গ্রামের সাধারণ অবস্থা থেকে কলকাতা গিয়েছেন, নিজের চেষ্টায় উন্নতি সাধন করেছেন। পরে ঢাকায় এসেছেন, নিজেকে সেই সঙ্গে ইত্তেফাককে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে তখনকার স্বাধীনতা আন্দোলনে ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় মওলানা আকরম খাঁ-ও আজাদ, মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে পালন করেছিলেন এমনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাও আমাদের ইতিহাসের একটি ধাপ—তা ঠিক হয়েছিল না ভুল হয়েছিল তাও বিচার্য। ইতিহাসকে মুছে দেওয়ার মনোভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। নানাভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। এতে আমাদের জাতির আত্মাই বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। এটাই হচ্ছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও জাতির জন্য আমাদের মর্মান্তিক ক্ষতি। দল-মত নির্বিশেষে রাজনীতিবিদরা, বুদ্ধিজীবীরা ও ধনী লোকেরা এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। ইতিহাসকে রক্ষা করতে না পারা গোটা জাতির ব্যর্থতার প্রমাণ। জনসাধারণ ঘুমিয়ে আছে। শুভবুদ্ধি পরাজিত। প্রচার মাধ্যমের শক্তি এখন অতুলনীয়। প্রচার মাধ্যম সম্পূর্ণত ব্যস্ত আছে প্রচলিত অবস্থা বা Status quo বজায় রাখার কাজে। গোটা জাতি ভুগছে জাতীয় হীনতাবোধে। সামাজিক মাধ্যম বলে যে মাধ্যম, তারও কার্যকারিতা আছে এবং তাকেও দমন করে রাখার জন্য বিধি-বিধান জারি করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর চিন্তা ও বিচার বিবেচনা দরকার। এই বাস্তবতায় সাধারণভাবে প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিচার বিবেচনার সময় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার দরকার আছে। আমাদের দেশের প্রচার মাধ্যমের ইতিহাসে মওলানা আকরম খাঁ ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সবচেয়ে উজ্জ্বল দুটি নাম।

মানিক মিয়ার জন্ম বর্তমান পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে ১৯১১ সালে। তিনি পিরোজপুর সরকারি হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বি এ পাস করেন। পরে তিনি সরকারি জনসংযোগ বিভাগে বরিশালে জনসংযোগ অফিসারের কাজ করেন। শিক্ষা সমাপনের পরেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে তিনি অভিভাবক রূপে গ্রহণ করেন। সোহরাওয়ার্দীও তাকে একান্ত বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে এবং রাজনৈতিক জীবনের সহায়ক রূপে গ্রহণ করেন। মানিক মিয়ার জীবনে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা এবং সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিতে ইত্তেফাকের মাধ্যমে মানিক মিয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন করতে গিয়ে মানিক মিয়া শেরে বাংলা ফজলুল হকের ও মওলানা ভাসানীর বিরোধিতা করেছিলেন। এই ভূমিকা বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে। খাজা নাজিমউদ্দিনের রাজনীতির প্রতি মানিক মিয়ার বিরূপতা ছিল।

সোহরাওয়ার্দীর অভিপ্রায় অনুযায়ী মানিক মিয়া কলকাতায় বেঙ্গল মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন থেকেই তিনি সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য রূপে সক্রিয় ছিলেন। মানিক মিয়া রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না হয়ে রাজনৈতিক বিষয়ে চিন্তাচর্চা করতেন এবং সংবাদপত্রে লিখতেন। তা দ্বারা তিনি রাজনীতিকে প্রভাবিত করতেন। তখন রাজনীতিতে চিন্তা মূল্য পেত। ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী যখন আর বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারলেন না তখন তিনি মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারির পদ ত্যাগ করেন। সোহরাওয়ার্দী ইত্তেহাদ পত্রিকা প্রকাশ করলে তিনি পরিচালনা বোর্ডের সচিব ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠিত হলে সভাপতি মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠিত হয় ও তাতে তিনি সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালের পূর্ববাংলা প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে ইত্তেফাককে দৈনিক করা হয়। মানিক মিয়ার সম্পাদনায় তখন ইত্তেফাক ছিল অসাধারণ জনপ্রিয় পত্রিকা । যখন আজাদের একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা ছিল তখন ইত্তেফাক প্রতিকূলতার মধ্যে নিজের স্থান করে নেয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকালে ইত্তেফাক যুক্তফ্রন্টের মুখপত্র হয়ে ওঠে। তখন মানিক মিয়ার লেখার অসাধারণ জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতা ছিল।

আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পরেই যাঁরা গ্রেফতার হন মানিক মিয়া তাঁদের একজন। প্রায় এক বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। ১৯৬২ সালে ইত্তেফাক আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলনকে দৃঢ় সমর্থন প্রদান করে। তার জন্য তিনি কারানির্যাতন ভোগ করেন। ছয়দফা কর্মসূচিকে ও আন্দোলনকে তিনি দৃঢ় সমর্থন দেন। তাতে তিনি আইয়ুব সরকারের কোপ দৃষ্টিতে পড়েন। এই সময়েও তিনি কারারুদ্ধ হন। তখন সরকার ইত্তেফাকের প্রকাশ নিষিদ্ধ করে। ইত্তেফাকের ছাপাখানা নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করে। পূর্বাণী নামে একটি বিনোদনমূলক সাপ্তাহিক পত্রিকাও ইত্তেফাকের সঙ্গে ছিল। প্রেস বাজেয়াপ্ত করার ফলে ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণীও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের মার্চে তিনি অসুস্থ অবস্থায় মুক্তি পান। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইত্তেফাকের ও প্রেসের ওপর থেকে বাজেয়াপ্তি আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তখন তাঁর সম্পাদনায় ইত্তেফাক পুনরায় প্রকাশিত হয়। তিনি সাংবাদিকদের সভা-সমিতিতে, সংস্থায় ও প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির আদর্শে পাকিস্তানে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে লিখেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য না হয়েও ইত্তেফাকের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে অসাধারণত্ব ছিল, রুক্ষতাও ছিল। তিনি কথার মূল্য রক্ষা করে চলতেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনকালে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তাতে তিনি রবীন্দ্র-জন্মবার্ষিকী উদযাপনের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তখন ইত্তেফাকের সহযোগী ছিল দৈনিক সংবাদ। মূল বিতর্কের একদিকে ছিল আজাদ, অপরদিকে ছিল ইত্তেফাক ও সংবাদ। সেটা ছিল বুদ্ধিজীবীদের এক রাজনৈতিক বিতর্ক। ১৯৬৪ সালের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়ে যে বুদ্ধিজীবীরা দাঙ্গার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ঢাকায় হিন্দু পরিবারগুলোকে রক্ষা করার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের শীর্ষস্থানে ছিলেন মানিক মিয়া। তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ নামে যে প্রচারপত্র প্রচার করা হয়েছিল তা তাঁরই লেখা। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের নেতারা মানিক মিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

মানিক মিয়া কাজ করেছিলেন প্রতিকূলতার পর প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে। নানা ষড়যন্ত্রও তার বিরুদ্ধে হয়েছে। তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেগুলো মোকাবিলা করেছেন।

পাকিস্তান লেখক সঙ্ঘ, পাকিস্তান কাউন্সিল দল ন্যাশনাল ইন্টিগ্রাশন, ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকন্সট্রাকশন প্রভৃতি সংস্থা আইয়ুব সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাকিস্তানবাদী সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য। এগুলোতে সরকার বুদ্ধিজীবীদের কর্মরত রাখার জন্য বিস্তর অর্থও ব্যয় করেছে। ঢাকার বুদ্ধিজীবীরা তখন ব্যাপকভাবে এগুলোতে আত্মবিক্রয় করেছেন। তখন যারা আত্মবিক্রীত বুদ্ধিজীবীদের বাইরে থেকে স্বাধীন চিন্তাশীলতার পরিচয় দিচ্ছিলেন ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করে স্বাধীনচেতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের মধ্যে মানিক মিয়া ছিলেন। সে সময়ে কাজী মোতাহার হোসেন, সিকানদার আবু জাফর, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুল হক, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর ছিলেন। তাদের প্রতি জনসমর্থন ছিল। এখন তেমন বৌদ্ধিক চরিত্রবল সম্পন্ন বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে সুলভ নয়। বৌদ্ধিক চরিত্র ও প্রগতিশীল চিন্তাকে সমর্থন দেওয়ার সেই জনমনও এখন নেই। তখন গণজাগরণ ছিল। এসব গণজাগরণের মাঝে হুজুগ আছে। গণজাগরণে জনগণের মধ্যে মহত্ মানবিক গুণাবলী জাগ্রত থাকে, মহান লক্ষ্য থাকে, মহত্ নেতৃত্ব থাকে। হীন স্বার্থান্বেষীরা প্রচারমাধ্যমের সহায়তা নিয়ে জনসাধারণকে আন্দোলনে মাতায় হীন স্বার্থ হাসিল করে নেওয়ার জন্য। আজ দরকার নতুন রেনেসাঁস ও নতুন গণজাগরণ এর লক্ষ্য নতুনভাবে স্থির করতে হবে। বাংলাদেশের মন পড়ে আছে অতীতের গর্ভে। অতীতের গর্ভ থেকে বর্তমানকে মুক্ত করতে হবে এবং উজ্জ্বল নতুন ভবিষ্যত্ সৃষ্টি করতে হবে।

n লেখক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, অধ্যাপক