অগ্নিকাণ্ড :সচেতনতা জরুরি

সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে ইন্টারন্যাশনাল ফায়ার সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি প্রক্সপো— ইফসি-২০২০ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইলেকট্রনিকস সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ—ইসাব গত বত্সরের অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলিয়া ধরিয়াছে, যাহা রীতিমতো উদ্বেগজনক। ইহাতে বলা হইয়াছে, ২০১৯ সালেই কেবল ছোটো-বড়ো মিলাইয়া আগুন লাগিবার ঘটনা ঘটিয়াছে মোট ২৪ হাজার ৭৪টি। ইহাতে মৃত্যু হইয়াছে ১৮৫ জনের। আহত হইয়াছেন ৫৮৬ জন। সম্পদহানি হইয়াছে ৩৩০ কোটি ৪১ লক্ষ ২৮ হাজার ৭৪৪ টাকার। জানমালের এই বিশাল ক্ষতি এককথায় অপূরণীয়। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পুরাতন ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ছিল মর্মান্তিক । ইহাতে নিহত হন ৭১ জন। এই ঘটনাটি ২০১০ সালের ৩ জুন পুরাতন ঢাকার নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে স্মরণ করাইয়া দেয়, যাহাতে প্রাণ হারাইয়াছিলেন ১২০ জনেরও বেশি। এমন লোমহর্ষক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রতি বত্সরই ঘটিতেছে।

অগ্নিকাণ্ডের অনেক কারণ রহিয়াছে। তাহার মধ্যে অপরিকল্পিত ও অননুমোদিত ভবনই বড়ো কারণ। যে যাহার মতো ভবন তৈরি করিতেছেন। সেইখানে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানকে গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে না। বিশেষত বহুতল ভবনগুলি এই ক্ষেত্রে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। গত বত্সর বনানীর এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমরা এখনো ভুলিতে পারি নাই। ভাসানটেক বস্তি, কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানা ও গাজীপুরের ফ্যান তৈরির কারখানায় আগুন লাগিবার ঘটনাও ছিল বহুল আলোচিত। এই সকল ঘটনা আমাদের বিষাদময় করিয়া তুলিয়াছিল; কিন্তু আমরা এই সকল ঘটনা হইতে শিক্ষা লাভ করিতেছি না। পোশাকশিল্পে একসময় ঘন ঘন আগুন লাগিত; কিন্তু বিদেশি বায়ারদের চাপে নিরাপত্তাগত বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের পর এখন অনেকটাই নিরাপদ এই সকল কারখানা। এই দৃষ্টান্ত অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন অনুসৃত হইবে না? কেন আমাদের নিরাপত্তার জন্য অন্যের চাপের উপর নির্ভর করিতে হইবে?

আমরা জানি, রাসায়নিক পদার্থ অত্যন্ত দাহ্য। এইজন্য রাসায়নিক গুদাম আবাসিক এলাকার বাহিরে রাখিতে হইবে। দোকানে স্যাম্পল প্রদর্শনের জন্য যত্সামান্য রাখা যাইতে পারে। আবার ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলা হইতেও অনেক সময় অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হইতে পারে। দমকলবাহিনীর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি বত্সর যে অগ্নিকাণ্ড ঘটে তাহার ৪০ হইতে ৫০ ভাগই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট হইতে সৃষ্টি হয়। অনেক সময় প্রাকৃতিক অথবা স্যাবোটাজ বা নাশকতার কারণেও ঘটিতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আবার কেহ কেহ ইনসিওরেন্সের অর্থ পাইতে বা ব্যাংক ঋণ মওকুফের অভিপ্রায়ে অপকৌশলের আশ্রয় লইয়া নিজ প্রতিষ্ঠানে নিজেরাই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটাইয়া থাকে এমন অভিযোগও কম নহে। কয়েক বত্সর পরপরই আমাদের বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের লাইন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষানিরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নকল ও নিম্নমানের তার ও সরঞ্জাম পরিহার করা। দিয়াশলাই, মোমবাতি, কয়েল, সিগারেট প্রভৃতি অগ্নি উদ্ধারক বস্তু ব্যবহারেও আমাদের হইতে হইবে সজাগ ও সচেতন। বিভিন্ন বহুতল ভবনে ফায়ার ইস্টিগুশন বা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা এবং সকল উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণ করাও অত্যন্ত জরুরি।