ফুলনগরী নামে পরিচিতি পেয়েছে কালীগঞ্জ। যশোর ও ঝিনাইদহ এই দুই জেলা থেকে সারাদেশে পাঠানো হয় হরেক রকমের ফুল। এই দুুই জেলা বাংলাদেশের ফুলের প্রায় অর্ধেক চাহিদা পূরণ করে। ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শুধু ঝিনাইদহের ফুলচাষিরা আড়াই কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে ফুলচাষিরা তাদের খেতের ফুল পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় ফুলের আবাদ হয়েছে ৯০ হেক্টর জমিতে। কালীগঞ্জে চাষ হওয়া ফুলের মধ্যে রয়েছে লিলিয়াম, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, ভুট্টাফুল, গাঁদাসহ বিভিন্ন রকমের ফুল। কালীগঞ্জের বড়ো ফুলচাষিরা জানান, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যখন টাকা লগ্নি করে তখন এ অঞ্চলের মানুষ দেউলিয়া হয়ে পড়ে। সে সময় থেকে তারা ফুল চাষ করেন।
ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী টিপু সুলতান জানান, তিনি ২৭ বছর ধরে ফুলের সঙ্গে জড়িত। সর্বশেষ গত ২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডের ফুল লিলিয়ামের চাষ করেন। নেদারল্যান্ড থেকে ২৯ লাখ টাকা দিয়ে ৬০ হাজার পিস লিলিয়াম ফুলের বীজ আনেন। জাহাজ ভাড়া সাড়ে ৩ লাখ টাকাসহ অন্যান্য খরচ দিয়ে তার মোট লিলিয়াম ফুলের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৪৬ লাখ টাকা। তার ফুলের আবাদ দেখার জন্য রয়েছে চার জন স্থায়ী কর্মী। এছাড়া প্রতি দিন ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি পরিচর্যার জন্য কাজ করেন। স্থায়ী চার জনকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়। বাকিদের প্রতি দিন জনপ্রতি ২০০ টাকা করে হাজিরা দেন। সবমিলে প্রতি বছর ব্যয় হয় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকা। বছরে তিনি অর্ধ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করেন বলেও জানান। ব্যয় বাদে তার বছরে লাভ থাকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। এ ব্যবসায়ী আরো জানান, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ফুলের ব্যবসা ভালো হয়। তিনি পাইকারিহারে একটি লিলিয়াম ফুল ১০০ টাকা, জারবেরা ৬ থেকে ১৮ টাকা, গ্লাডিওলাস ৭ থেকে ১৯ টাকা, গোলাপ ২ থেকে ১০ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা ১ থেকে ৩ টাকা বিক্রি করেন। অবশ্য বাজার ভালো হলে দাম বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও ভাষা দিবস দুটিতে তিনি ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করবেন। তিনি দাবি করেন, চলতি বছরে ঝিনাইদহ জেলা থেকে দুই দিবসে ২ থেকে আড়াই কোটি টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ডুমুরতলা গ্রামের ফুলচাষি মিজানুর রহমান জানান, তারা গাঁদা ফুলের চাষ করেন। চলতি বছর তিনি পাঁচ কাঠা, একই এলাকার মোহাম্মদ আলী ও এমদাদুল হক আট কাঠা, আব্দুল আলীম পাঁচ কাঠায় ফুলের আবাদ করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃপাংশু শেখর বিশ্বাস জানান, ‘জেলায় এ বছর প্রায় ২০৮ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। উত্পাদন ব্যয় কম, আবার লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি গাঁদা ফুল চাষ হয় কালীগঞ্জের বালিয়াডাঙ্গা এলাকায়। এ কারণে সবাই এখন এই এলাকাকে ফুলনগরী বলেই চেনেন।’ সরেজমিনে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জের মেইন বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, দুপুর থেকে শত শত কৃষক তাদের খেতের উত্পাদিত ফুল ভ্যান, স্কুটার ও ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন পরিবহনযোগে নিয়ে আসছেন। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যান্ড ভরে যায় লাল, সাদা আর হলুদ ফুলে ফুলে। ফুলচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ফুল ক্রয় করেন এ বাজারের শুকুর আলী, ইউসুফ আলী, প্রদীপ বাবু, শামীম, ফজলুর রহমানসহ একাধিক ফুল ব্যবসায়ী। তারা জানান, অনেক ফুলচাষি নিজেরা বাজারে না এসে সারা বছর তাদের খেতের ফুল চুক্তি মোতাবেক ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড়ো বড়ো শহরের ফুলের আড়তে পাঠিয়ে দেন। এ সকল আড়তদার বিক্রির পর তাদের কমিশন রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেন। ফলে ফুলচাষিদের টাকা খরচ করে ফুল বিক্রির জন্য কোথাও যাওয়া লাগে না। তারা মোবাইল বা ফোনালাপের মাধ্যমে দর ঠিকঠাক করে ফুল পাঠিয়ে থাকেন।