হাজার ছাড়িয়েছে মৃতের সংখ্যা

চীনে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬ জনে। সোমবার এক দিনে ১০৮ জন মারা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানিয়েছে, সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত দেশটির মূল ভূখণ্ডে অন্তত ২ হাজার ৪৭৮ জন নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এতে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৬৩৮ জনে। সোমবার মৃতদের ১০৩ জনই মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের। অন্তত ২০ হাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসের উত্সস্থল উহানে পাঠানো হয়েছে। আরো কয়েকটি টিম সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। চীন বেশ কয়েক জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অপসারণ করেছে। হুবেই স্বাস্থ্য কমিশনের পার্টি সেক্রেটারি ও কমিশনের প্রধান চাকরি হারানোদের মধ্যে রয়েছেন।

চীনের জাতীয় হেলথ কমিশনের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৩ হাজার ২৮১ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এছাড়া অন্তত ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫১৮ জন চিকিত্সকের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।        এ ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ও প্রাণহানি বাড়তে থাকায় বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে অধিকাংশ দেশ। করোনা ভাইরাস ২৮টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চীন ছাড়া হংকং ও ফিলিপাইনে দুজন মারা গেছে। করোনা ভাইরাস ‘বিশ্বের অন্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে’ বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেডরস আধানম গোব্রিয়াসেস। তিনি প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের নমুনা অন্যদের সঙ্গে বিনিময় করতে এবং এর প্রতিষেধক ও ওষুধ তৈরির জন্য গবেষণা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে ওষুধ, ডায়াগনস্টিকস ও ফ্লু-জাতীয় ভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে দুই দিনের বৈঠকের শুরুতে বক্তব্য রাখেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান। বৈঠকে চার শতাধিক গবেষক ও জাতীয় কর্তৃপক্ষ অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে চীন ও তাইওয়ান থেকে কেউ কেউ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন।

চীনফেরত যে যুবককে রংপুর থেকে ঢাকায় এনে হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে রাখা হয়েছে, তাকে পরীক্ষা করে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ঐ যুবককে ‘কোয়ারেন্টাইন’ করা হয়েছে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে। তার মধ্যে করোনা ভাইরাসের কোনো লক্ষণ-উপসর্গ নেই। অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, ‘তার বেশি সমস্যা হচ্ছে দুটি পায়ে। ব্যথার কারণে হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি যেতে পারবেন।’

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৫৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারো শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি।  এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, রোগী সামাজিকভাবে হেয় হয় এমন তথ্য প্রচার করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, এটা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। রোগীর নাম, ঠিকানা, ছবি এসব যেন আমরা প্রকাশ না করি। শুধু গণমাধ্যমকর্মী নন, আমাদের যারা চিকিত্সক বা হাসপাতালে যারা কাজ করছেন, তাদেরও সচেতন হতে হবে। এটা আমাদের দিক থেকেও যেন না যায়।

সিঙ্গাপুর প্রবাসী এক বাংলাদেশির শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ায় গত রবিবার তাকে নেওয়া হয়েছে আইসোলেশন ইউনিটে। তবে বাংলাদেশে কারো মধ্যে অথবা চীনে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশির মধ্যে এ ভাইরাস সংক্রমণের খবর আসেনি এখনো। সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত বাংলাদেশির চিকিত্সার খরচ সেদেশের সরকার বহন করছে জানিয়ে অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ মিশন এ বিষয়ে আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

অপরদিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত বিভিন্ন ফ্লাইটের যাত্রীরা এখন টিভি স্ক্রিনে থার্মাল স্ক্যানারে পরীক্ষার ফলাফল নিজেরাই দেখতে পারবে। এতদিন ফলাফল শুধু বিমানবন্দরে কর্মরত স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দেখতে পারতেন। প্রত্যেক যাত্রী যেন থার্মাল ও হ্যান্ডহেল্ড স্ক্যানারে (জ্বর মাপার যন্ত্র) পরীক্ষার ফলাফল সচক্ষে দেখতে পারে, সেজন্য ৫৫ ইঞ্চি মনিটর বসানো হচ্ছে। ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর হলে যাত্রীর চেহারায় (বাইরের অংশ) লাল বাতি আর জ্বর না থাকলে সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে। এছাড়া আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য ডেস্কে এসে দ্রুত স্ক্রিনিং সম্পন্ন করার অনুরোধ জানিয়ে অডিও বার্তাও প্রচার করা হবে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আগত সব ফ্লাইটের যাত্রীদের থার্মাল স্ক্যানারে স্ক্রিনিং করার কারণে যাত্রীজট তৈরি হচ্ছে। ফ্লাইট থেকে নামার পর স্ক্রিনিং ও ইমিগ্রেশন শেষ করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। দু-তিনটি ফ্লাইট একযোগে এলেই শত শত যাত্রীর উপস্থিতিতে ইমিগ্রেশন এলাকা হাটবাজারে পরিণত হয়।

করোনা ভাইরাস ঝুঁকি পরীক্ষার মোবাইল অ্যাপ এনেছে চীন

ব্যবহারকারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন কি না, তা পরীক্ষার জন্য চীনে ‘ক্লোজ কন্টাক্ট ডিটেক্টর’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হয়েছে। যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়া কোনো ব্যক্তি এই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারকারীর আশপাশে থাকে, তাহলে কুইক রেসপন্স (কিউআর) কোড স্ক্যানের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীকে ঐ আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হবে। এর আগে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তি যেন কোনো অবস্থায়ই বাড়ির বাইরে না যায়। কিন্তু তারপরও মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে করোনা ভাইরাস চীনের মূল ভূখণ্ডে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নতুন এই অ্যাপ্লিকেশন চীনের সরকারি কর্তৃপক্ষের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে। এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সরকার আরো কাছ থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের নজরদারিতে রাখতে পারবে বলে প্রযুক্তি বিশারদরা জানিয়েছেন।

চীনের তিন শহরে জ্বর-কাশির ওষুধ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা

চীনের অন্তত তিনটি শহরে জ্বর ও কাশির ওষুধ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। অসুস্থরা যাতে বাড়িতে ওষুধ সেবন না করে হাসপাতালে ভর্তি হয়, সেজন্যই এমন পদক্ষেপ। কেননা, হাসপাতালে ভর্তি হলে তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কি না, তা পরীক্ষা করা যাবে।