শতভাগ বিদ্যুতের আলোয় ৪১০ উপজেলা
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশের ৪১০টি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়িত হলো। মুজিববর্ষের মধ্যে দেশের সব মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার মাধ্যমে প্রতিটি ঘরকে আলোকিত করা হবে। কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। এ লক্ষ্যে নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাতটি জেলা ও ২৩টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং ফেনী ১১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ পাঁচটি প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের ৬৪টি জেলায় মোট ৪৯২টি উপজেলা রয়েছে। ফলে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আসতে বাকি আছে ৮২টি উপজেলা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষ বিদ্যুত্ পাচ্ছে। আমাদের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ৪০টি এখন পুরোপুরি বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। বাকি জেলা ও উপজেলাকেও (শতভাগ বিদ্যুতের) আওতায় এনে মুজিববর্ষে প্রতিটি ঘরকে আলোকিত করব।’ একই অনুষ্ঠান থেকে রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্কে শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেটর অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের ৬৪টি জেলায় সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এই কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। গতকাল শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আসা দেশের সাত জেলার মধ্যে রয়েছে ঢাকা, ফেনী, গোপালগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, জয়পুরহাট ও মেহেরপুর। শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আসা ২৩ উপজেলার মধ্যে রয়েছে বাগেরহাট সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, মেহেরপুরের আলমডাঙ্গা, কুমিল্লার দেবীদ্বার ও মোহনগঞ্জ, দিনাজপুরের খানসামা, জামালপুরের মাদারগঞ্জ, যশোরের যশোর সদর ও মনিরামপুর, খুলনায় তেরখাদা, কুষ্টিয়ার মিরপুর, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও জুড়ি, নওগাঁর বদলগাছি
ও পত্নীতলা, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, নীলফামারীর জলঢাকা, শেরপুরের নকলা ও ঝিনাইগাতী, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল এবং সুনামগঞ্জের ছাতক।
‘শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেটর অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে তরুণ-যুবকেরা ট্রেনিং নেবে, এর ফলে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, তারা নিজেরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭২ হাজার বর্গফুটের এই আইটি ইনকিউবেটর কেন্দ্রে বহুমুখী প্রশিক্ষণ, উচ্চমানের স্টার্ট-আপস, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে এখানে সব ধরনের ব্যাবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এম তাজুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, আইসিটি বিভাগ প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, এ কে এম রহমতউল্লাহ এমপি, শহীদুজ্জামান সরকার এমপি এবং সংশ্লিষ্ট সচিবরা গণভবনে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন, আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সেক্রেটারি এ এন এম জিয়াউল আলম অনুষ্ঠানে শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেটর এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ হাইটেক পার্কগুলোর উন্নয়নের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন এবং বিদ্যুত্ বিভাগের সচিব ড. সুলতান আহমেদ বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নের ওপর পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন।
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং পরে একটি পৃথক ভিডিও কনফারেন্সে সারাদেশে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের মাসব্যাপী নাট্যোত্সবের উদ্বোধন করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বিপথগামী শিশু, কিশোর, যুবকদের সুপথে আনতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শিল্পী-সাহিত্যিকরাই প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়েছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর নির্মলেন্দু গুণের যে কবিতাটা.. এই কবিতাটা যেন শুধু ৭ই মার্চের ভাষণের কথা না, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছিল।
জাতির পিতাকে হত্যার পর স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ক্ষমতায় বসলে দেশ পিছিয়ে গিয়েছিল বলেও উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা কিন্তু এই নাটকের ওপর অনেক ধরনের কালাকানুন জারি করেছিল। সেই কালাকানুনগুলো ছিয়ানব্বই সালে সরকারে এসে আমরা তুলে নেই। নাটকের ওপর যে সেন্সর করা হতো, সেই সেন্সর প্রথাটা সম্পূর্ণ তুলে দিয়েছিলাম। আজকে বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জেলায় এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত যেন এই শিল্পের চর্চা হয় সেই ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি নিজের অনুরাগের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নূরুলদীনের সারাজীবন নাটকটা যখন মহিলা সমিতি নাট্যমঞ্চে হতো-কয়েকবারই আমি-কাউকে না বলে নিজে টিকিট কিনে সেখানে চুপচাপ গিয়ে বসেছি। যখনই নাটক শুরু হবে তখনই সেখানে চলে গিয়েছি। নাটকটা অন্তত আমি দুই/তিন বার দেখেছি। আর যতবার দেখেছি আমি চোখের পানি রাখতে পারিনি।’ দেশের উন্নয়নযাত্রায় সংস্কৃতিচর্চাও জরুরি বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।