বিশ্ব এবং আমাদের অর্থনীতিতে হুমকি

চীনের হুবেই প্রদেশ হইতে ছড়াইয়া পড়া করোনাভাইরাস ডিজিস বা কভিড-১৯ আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে। গত বৃহস্পতিবার এক দিনেই সর্বোচ্চসংখ্যক ২৫৪ জনের মৃত্যু হইয়াছে। আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়িতেছে দ্রুত হারে। কেবল এক দিনেই নূতন করিয়া আক্রান্ত হইয়াছে প্রায় ১৫ হাজার। সব মিলাইয়া এখন অবধি আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়াইয়াছে। মৃত্যুর পাশাপাশি করোনা আতঙ্কের থাবা বিস্তার করিতেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে করোনা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। লন্ডন হইতে ইউরোপে নবম ব্যক্তির আক্রান্ত হইবার খবর মিলিয়াছে। পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যায় তাহা লইয়া জরুরি ভিত্তিতে বৈঠকে বসিতেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ। জাপানের উপকূলে দাঁড়াইয়া থাকা জাহাজে নূতন করিয়া ৪৪ জন করোনায় আক্রান্ত হইয়াছেন। ইহা লইয়া ঐ জাহাজটির যাত্রীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ২১৮ জনে। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানাইয়াছে, দেশটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ৫৮ জনে, যাহাদের মধ্যে বাংলাদেশিও রহিয়াছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করিতেছে, ভাইরাসটি মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরি হইতেছে—ইহা বলিবার মতো সময় এখনো আসে নাই। ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের শুরু, মাঝামাঝি নাকি শেষ পর্যায়ে আসিয়াছে—ইহাও স্পষ্ট নহে।

তবে একটি ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ভাইরাস কেবল চীন নহে, বিশ্বের অর্থনীতিকেই বেশ বড়ো ধরনের ঝাঁকুনি দিয়া যাইবে। ১৭ বত্সর আগে সার্স-এর সংক্রমণের সময়েও চীনের অর্থনীতিতে কম সময়ের জন্য উহার প্রভাব পড়িয়াছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের। বিশ্বের মোট আয়ের ১৬ শতাংশই আসে চীন হইতে। সুতরাং ইহার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়িতে যাইতেছে, যাহার চিত্র ক্রমশই স্পষ্ট হইতে শুরু করিয়াছে। আর ইহার বড়ো প্রভাব পড়িবে আমাদের অর্থনীতিতেও। বিশেষ করিয়া তৈরি পোশাক খাতে। কারণ বাংলাদেশ হইতে রপ্তানিজাত বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে চীন হইতে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চীনে কারখানা বন্ধ থাকায় সময়মতো কাঁচামাল শিপমেন্ট হইতেছে না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ কারখানার হাতে সাধারণত অল্প কিছু দিন চলিবার মতো কাঁচামাল থাকে। সুতরাং চীনে সমস্যা যদি আরো দীর্ঘায়িত হয়, তাহা হইলে মার্চের শিপমেন্ট বিলম্বিত হইবে অথবা বাতিল হইবে। এপ্রিলের মাঝখানে অনেকগুলি ফ্যাক্টরিতে কাঁচামালের সংকট দেখা দিতে পারে। তখন ওয়ার্কারদের দেওয়ার মতো কাজ থাকিবে না বলিয়া আশঙ্কা করিতেছে অনেকে। এমনকি এখনই যেই সকল জাহাজে পণ্য আসিতেছে, তাহাতেও কনটেইনার অনেক কম। অর্থাত্ ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর হইতে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙিতে শুরু করিয়াছে। ভবিষ্যত্ অর্ডারের জন্য স্যাম্পল অ্যাপ্রুভাল, স্যাম্পল ডেভেলপমেন্টের মতো অনেক বিষয় রহিয়াছে—যেইগুলির ক্ষতি আসলে এখনই বোঝা যাইবে না।

সংকটের সময়ই আসল পরীক্ষা দিতে হয় ম্যানেজমেন্টকে। এই ক্ষেত্রেও ম্যানেজমেন্টের মুনশিয়ানার ওপর নির্ভর করিতেছে সংকট কাটাইবার সম্ভাবনা। আশা করা যায়, ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথ বুদ্ধিমত্তা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এই সংকট হইতে উত্তরণ ঘটাইতে পারিবেন।