ড. আর এম দেবনাথ
পর্যটনের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির সম্পর্ক কতটুকু? প্রশ্নটি আরেকভাবেও করা যায়। পর্যটনের সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পর্ক কতটুকু? দশ-পনেরো বছর আগে কেউ প্রশ্ন করলে বলা যেত সম্পর্ক উভয়ের সঙ্গেই আছে। কিন্তু ততটা গভীর কিছু নয়। কারণ তখনো পর্যটনশিল্প হাটি হাটি পা পা করছে। বলা যায়, উদীয়মান শিল্প খাত। কিন্তু এখন আর তা বলা যায় না। অতি সাম্প্রতিক কালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্যবসায়-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানিবাণিজ্যে অভূতপূর্ব উন্নতি, ধারাবাহিকভাবে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ফলে পর্যটনশিল্পটি বেশ আকর্ষণীয় ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নানা তথ্যে দৃশ্যমান যে, এই শিল্পটি এখন চাপের মুখে। দৈনিক ইত্তেফাকে ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে একটি খবর ছাপা হয়েছে, যার শিরোনাম— কমছে পর্যটক, আয় কমছে বিমান সংস্থার। খবরটি ছোটো। দৃশ্যত মনে হয় খবরটির কোনো ব্যাবসায়িক অর্থনৈতিক গুরুত্ব নেই। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটা বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট খবরটির ভেতরে গেলে। খবরের ভেতরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পর্যটক-আকর্ষণে যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখনই করোনা ভাইরাসের প্রভাব পর্যটন খাতের আয়ে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দেখা যাচ্ছে, বিমান সংস্থাগুলোর আয় কমছে। বলা বাহুল্য, এর প্রভাব থেকে আমরাও মুক্ত নই।
আমাদের পর্যটনশিল্প একটা বিকাশমান শিল্প খাত। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের পর্যটকরা যেমন বিরাট সংখ্যায় বিদেশ যাচ্ছে তেমনি বর্ধিষ্ণু সংখ্যায় বিদেশিরাও আমাদের দেশে আসছে। বাংলাদেশি যাচ্ছে শুধু লেখাপাড়া, চিকিত্সা ও বেড়ানোর জন্য নয় বরং আমাদের দেশের লোকেরা ব্যাবসায়িক কারণেও বিদেশ যাচ্ছে যখন-তখন। বস্তুত উভয় দিকেই পর্যটনব্যবসায় বর্ধিষ্ণু। বাংলাদেশে আসছে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারী ব্যাংকার, নানা ধরনের কর্মী, ব্যবস্থাপক, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি শ্রেণির লোক। ইত্তেফাকের খবর হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের কারণে বাইরে থেকে লোক আসছে কম। চীনে সংক্রামক এই ব্যাধির কারণে পৃথিবীর অনেক দেশ চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে। সকলের মতো আমাদেরকেও বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। চীনে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের অনেককেই দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে অন্যত্র। চীন আমাদের কাছে শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়। চীন থেকে আমরা প্রতিবছর বিশাল পরিমাণ মাল আমদানি করি। বস্তুত মোট আমদানির সিংহভাগই এখন চীন থেকে। তার পরের দেশ হচ্ছে ভারত, সেখান থেকেও প্রচুর পণ্য আমদানি হয়। পর্যটক আসা কমে যাওয়া, বিমান কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়ার অর্থ—আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের চীনে যাওয়া এবং চীন থেকে বাংলাদেশ আসা ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমার দিকে। চীন থেকে আসে শিল্পের যন্ত্রপাতি। গার্মেন্টস খাতের যন্ত্রপাতি। আসে কাঁচামাল। কাপড় আসে, তুলা আসে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ছাড়াও আসে মধ্যবর্তী পণ্য। এমনকি ভোগ্যপণ্য। যেমন চীন থেকে আসে রসুন, আদা ইত্যাদি ভোগ্যপণ্য। বস্তুত চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের তালিকা করা কঠিন একটি বিষয়। এ ছাড়া চীনের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ প্রচুর অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। ব্রিজ, টানেল, ওভারপাস, বড়ো বড়ো রাস্তা ইত্যাদি ছাড়াও রয়েছে বিশাল বিশাল প্রকল্প। এতে চীনাদের বিনিয়োগ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এই সূত্রে চীনা ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, কারিগরি লোকজন দেশে শত শত কর্মরত। এই ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হওয়ার অর্থ আমাদের শিল্পায়ন বিঘ্নিত হওয়া। সবচেয়ে আশঙ্কার খবর হচ্ছে গার্মেন্টস খাত নিয়ে। প্রতিদিন কাগজে এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। অনেক কারখানার কাঁচামাল ফুরিয়ে গেছে। অথচ তা আনার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। রাতারাতি মালও চীনে পাঠানো যাচ্ছে না। শুধু চীনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, আমাদের প্রতিবেশী দেশ এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অনেক পর্যটন সংগঠন তাদের ব্যবসায় সীমিত করে ফেলেছেন।
পরিকল্পিত অনেক ‘ট্যুর’ বাতিল হচ্ছে। যেটা হওয়ার কথা নয়, তাও হচ্ছে। দেশীয়ভাবে মানুষের মধ্যে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। চীনের সঙ্গে ব্যাবসায়িক যোগাযোগ হ্রাস পাচ্ছে তাদের ব্যাবসায়িক পার্টনারদের সঙ্গে। চীনাদের আমদানি-রপ্তানিও হ্রাস পাচ্ছে। ইউরোপীয় দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই চীনের মালামালের বড়ো ক্রেতা। তারা সতর্কতা অবলম্বন করায় চীনা ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চীনা অনেক কোম্পানি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করেছে। চীনা সরকার যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশ্বের অনেক দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিন। এসব বিদ্যমান বাস্তবতা থেকে বোঝা যায়, বিশ্ব অর্থনীতি একটা বিরাট চাপের মধ্যে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম অর্থনীতির দেশ। দুইয়ের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে বেশ কিছুদিন। এতে সারা দুনিয়াই আতঙ্কিত। যখন দুই পরাশক্তির মধ্যে একই বোঝাপড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল ঠিক তখনই ‘করোনা ভাইরাস’ এসে সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। সারা বিশ্বের ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কম করা হচ্ছে। এর প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতেও পড়বে। আমাদের রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। কারণ ইউরোপীয়দের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতি নানা জটিলতার মধ্যে। সরকারের বহুমুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। এর কারণ ব্যাবসায়িক মন্দা এক ধরনের চলছে। রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের ঋণের ঘাটতি পড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন। এদিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস পেয়েছে। অবশ্য ইতিবাচক ধারা হচ্ছে রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতি। রেমিট্যান্স দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে গত জানুয়ারি মাসে। এদিকে শেয়ারবাজারকে উজ্জীবিত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে শেয়ারবাজারে আরো বিনিয়োগ করতে পারে তার জন্য একটা তহবিল গঠন করা হবে। তহবিল গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করবে। ‘করোনা ভাইরাস’ থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোর কাজ এখন সর্বাগ্রে করতে হবে। অবকাঠামোর কাজ যাতে যে কোনো মূল্যে চালু রাখা যায়, তার ব্যবস্থার কথা এখনই ভাবতে হবে। কোনো কারণেই যাতে কোনো মালিকের শিল্প বন্ধ না হয় তার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। বিকল্প আমদানি-রপ্তানির চিন্তা এখন থেকেই জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। একটা শিক্ষা পেঁয়াজ থেকে হয়েছে। শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পেঁয়াজে আমরা উচিত শিক্ষা পেয়েছি। এখন ‘করোনা ভাইরাসের’ শিক্ষা হচ্ছে আমদানিনির্ভরতা—চীনের ওপর। কি যন্ত্রপাতি, কি কাঁচামাল, কি মধ্যবর্তী পণ্য, কি অবকাঠামোগত ঋণ—সব ক্ষেত্রেই এক-দুই উেসর ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। এখন থেকে এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা দরকার। সবচেয়ে দুর্ভাবনার বিষয় আরেকটি। আর সেটি হচ্ছে ‘ঋণখেলাপি’ সমস্যা। বর্তমান মন্দা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, লোকসান দিলে ব্যাংকের ঋণের টাকা ফেরত আসবে—এই চিন্তা বাতুলতা মাত্র। ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিলে লাভ হোক, ক্ষতি হোক ঋণগ্রহীতাকে টাকা ফেরত দিতেই হয়, বাড়িঘর বিক্রি করে হলেও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ব্যবসায়ে লোকসান হলে তা ব্যাংকের। আর লাভ হলে ব্যবসায়ীর। আর মন্দার কারণে ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তো কথাই নেই। সকল বোঝা এসে পড়বে ব্যাংকের ওপর। কারণ আমাদের সকল বড়ো ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যাংকের টাকা দিয়ে ব্যবসায় করেন। একে বলা হচ্ছে ‘ব্যাংক ফিন্যান্স লেড গ্রোথ’। ব্যাংকের টাকায় ব্যবসায়। শেয়ারবাজারের টাকা খুব বেশি নেই। বিদেশি বিনিয়োগেও বেশি নেই। ব্যাংকের অল্প টাকায় বেশি দাবিদার থাকায় এই খাত নানা অনিয়মের শিকার। পরিণতি বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ। এর ওপর বর্তমান মন্দার একটা ধাক্কা লাগার আশঙ্কা। এতে ঋণখেলাপ সমস্যা আরো গভীরতর হতে পারে।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়