প্রকাশ ঘোষ বিধান
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা যৌথভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার।
গতকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ২০তম সুন্দরবন দিবস। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রুপান্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরো ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন। সেই সম্মেলনে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই দিবসের ঘোষণা দেওয়া হয়। সুন্দরবন সুরক্ষায় সরকার নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুন্দরবনের গুরুত্ব তুলে ধরা সহজ হবে।
সুন্দরবন বাংলার গর্ব, বিশ্বের গৌরব। জগেসরা ও জীববৈচিত্র্যের আধার এই বন বাঙালি জাতির গর্ব। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এই বন। এখানে রয়েছে প্রায় ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর, ৯ প্রজাতির শামুকসহ কুমির, হাঙ্গর ও ডলফিনসহ নানা প্রজাতির মাছ। তাছাড়া জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ৪৫০টি খাল ও নদী।
উপকূল অঞ্চলে মানুষের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে সুন্দরবন আবর্তিত। এই অর্থে সুন্দরবনের ভালো-মন্দ এ অঞ্চলের মানুষকে নাড়া দেয়। সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঘড়, জলচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপথকে আগলে রেখেছে ও রক্ষা করছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। এ কথা সত্য যে, সুন্দরবন না থাকলে সিডরের প্রচণ্ডতায় উপকূলীয় অঞ্চল প্রাণহীন এক বিরান ভূমিতে পরিণত হতো। সুন্দরবন এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থে সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে—এ কোনো আবেগ নয়, বাস্তবতায় অত্যন্ত যৌক্তিক।
বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ এবং মোট বনাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ জুড়ে থাকা এ বনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মূল্যবান প্রাণীজ, জলজ ও বনজ সম্পদ মিলে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। এই সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্রের উত্স নয়, একইসঙ্গে বন সংলগ্ন লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার উত্স হিসাবে অবদান রাখছে। কাঠ, মধু, মত্স্য, অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে প্রায় সারা বছর তারা সরাসরি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেই চলেছে। তাই এই বনের জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণের জন্য এখনই প্রয়োজন সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। তাহলে প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর থাকবে সুন্দরবন। বিকশিত হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প। এতে একদিকে যেমন সুন্দরবন বিশ্বসেরা সম্পদ হিসাবে পরিচিতি পাবে, তেমনি এ বনের সুরক্ষার কাজ হবে শক্তিশালী। দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়লে দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। উপকূলের অবহেলিত জনপদে প্রাণচাঞ্চল্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।
খুলনা