প্রাচীনকাল থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও পরিবর্তনশীল চরিত্র টিকিয়ে রেখেছে। এদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে নগর ও মহানগরের বিভিন্ন স্তরে একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বৈচিত্র্যময় নিদর্শন চোখে পড়ে। তারই সমান্তরালে সমকালীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ঐতিহ্যাচারী সংস্কৃতিবানদের প্রতি সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের অসচেতনতা ও অবহেলা দৃষ্টিগোচর হয়। সেই সঙ্গে যথার্থ জনসংস্কৃতি সমীক্ষণের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গবেষণা ও প্রকাশনার অপ্রতুলতা প্রত্যক্ষ করা যায়। আসলে প্রকৃত ঐতিহ্যপ্রীতির বোধ তথা ভক্তি ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিকোণ থেকে এদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বিচিত্র উপাদানের পূর্বাপর ইতিহাস এবং তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং তাতে প্রতিফলিত মানবপ্রেম বা সম্প্রদায় সম্প্রীতিবিষয়ক গবেষণা ও প্রকাশনার অভাব রয়েছে। এমনকি আমাদের জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতেও বাংলাদেশের সহস্রাব্দ প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চালচিত্র নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রচারণা দেখা যায় না। এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে চর্চিত ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কান্ডারি গায়ক-সাধকগণ, এমনকি তাদের পূর্বসাধক লালন সাঁই পর্যন্ত নতুন করে একশ্রেণির মৌলবাদীদের অমানবিক চক্রান্তের শিকার হয়ে চলেছেন। আমাদের বিবেচনা বলে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের অবহেলার পাশাপাশি মৌলবাদীদের অমানবিক আক্রমণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বর্তমানে চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
এ ধরনের হুমকির পূর্বাভিজ্ঞতা পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ভাষা আন্দোলনের সময় ভিন্নভাবে এসেছিল। এ বিষয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বর্ণনায় লিখেছেন, “আমি আব্বাসউদ্দীন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাসো, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।’ আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।” কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের অনুরোধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শুধু বাংলা ভাষা রক্ষায় অবদান রাখেননি, এদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা স্পষ্টভাবে এদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন। এমনকি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অধিভুক্ত ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ শীর্ষক ২৩ সংখ্যক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।’ এর পাশাপাশি ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক ২৩ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
এক্ষেত্রে এদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। তার পরও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি চর্চাকারী গায়ক-সাধকগণ নানাভাবে আক্রমণ ও বিরূপ মন্তব্যের শিকার হয়ে আসছেন। এমনটি চলতে থাকলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে নিবিষ্ঠ ব্যক্তি, সাধক, শিল্পীগণ সংস্কৃতিচর্চায় উত্সাহ হারাবেন এবং একসময় এদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অনেক উপাদান বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে এদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য আলাদাভাবে একটি নীতিমালা প্রয়োজন; যে নীতিমালার ভেতর দিয়ে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি চর্চাকারী সাধক, গায়ক, শিল্পীগণকে উত্সাহিত করা হবে এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য, সমালোচনা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।