বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
সরকারি হাইমচর মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর
১।
ক) আত্মসমর্পন দলিলে যৌথবাহিনীর পক্ষে কে স্বাক্ষর করেন ? খ) ’গণহত্যার’ধারণাটি ব্যাখ্যা করো। গ) চিত্র-১ বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন ঘটনার প্রতিচ্ছবি ?
ঘ) চিত্র-২ এ উল্লিখিত বাহিনীর কার্যক্রমই কী এ দেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করেছিল ? বিশ্লেষণ করো।
ক) উত্তর : যৌথবাহিনীর কমান্ডার লে.জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা আত্মসমর্পন দলিলে যৌথবাহিনীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন ।
খ) উত্তর : গণ অর্থ জনগণ আর হত্যা অর্থ নির্বিচারে খুুন করা। অর্থাত্ নির্বিচারে মানুষ বা জনগণকে খুুন করাই হলো ‘গণহত্যা’। জাতিসংঘের দৃষ্টিতে গণহত্যা হলো একটি জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় যা নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তত্কলীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদাররা যে নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
গ) উত্তর : চিত্র-১ বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার প্রতিচ্ছবি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী (সেনাবাহিনী) ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিদের ওপর অত্যাচার ও আক্রমণ চালায়। ভয়াবহ সেই রাতে শিশু,বৃদ্ধ,নারী,পুরুষ, ছাত্র-শিক্ষকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। শুধু ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকা শহরে ৭-৮ হাজার নিরিহ মানুষ অকাতরে প্রাণ হারায়। অন্যদিকে চিত্র-১ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ গণহত্যার দৃশ্য উঠে এসেছে। ১৯৩৯-১৯৪৫ সালব্যাপী এ মহাযুদ্ধে অসংখ্য গণহত্যার ঘটনা ঘটে। যাতে নিরাপরাধ বহু মানুষ প্রাণ হারায়। একইভাবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী (সেনাবাহিনী) ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর পরিকল্পিত আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতি বাঙালির ছিল না। ফলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ সারাদেশে চলে বাঙালি নিধন। ঢাকার বাহিরেও এ আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিদের এই হত্যাযজ্ঞই প্রতিচ্ছবিই চিত্র-১ ফুটে উঠেছে।
ঘ) উত্তর : হ্যাঁ, চিত্র-২ এ উল্লিখিত বাহিনীর কার্যক্রমই এ দেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছিল। চিত্র-২ এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যৌথবাহিনীর কার্যক্রম বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব রূপ লাভ করে। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক নির্দেশনা দেয়ার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। এই সরকার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য দেশকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে এবং সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ পরিকল্পনা করেন। যার ফলে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গনে সাহসের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলা করতে থাকেন। এই আক্রমণকে আরো গতিশীল করতেই মুজিবনগর সরকার এবং ভারত সরকার ২১ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী সম্মিলিতভাবে যৌথবাহিনী গঠন করে। যৌথবাহিনীর অধীনে ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে আক্রমণ জোরালো হয়। মূলত পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্রের বিপরীতে যৌথবাহিনী তার অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং সুনিপুন রণকৌশল ব্যবহার করে। আকাশপথে যৌথবাহিনীর বিমান আক্রমণ শুরু হওয়ার পর স্থলপথে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তান বাহিনীর ওপর গেরিলা হামলা বৃদ্ধি করে। যৌথবাহিনীর এই মুহূর্মুহু আক্রমণ পাকবাহিনীর রণকৌশল এবং মনোবলকে কাঁপিয়ে দেয়। ফলে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বাংলাদেশের এলাকাগুলো শত্রুমুক্ত হতে থাকে। যৌথবাহিনীর আক্রমণ এবং মুক্তিবাহিনীকে সহায়তার মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত হয়।