সদ্যসমাপ্ত কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

শেষ হলো কলকাতার ৪৪তম আন্তর্জাতিক বইমেলা। বইমেলা কর্তৃপক্ষ পাবলিশার্স গিল্ড এই মেলা উপলক্ষ্যে সমাজের সব শ্রেণির অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী, গায়ক, সাংবাদিক—সবাইকে নিয়ে প্রতিদিন মূলমঞ্চে নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলেন, শেষ দিন  ৯ ফেব্রুয়ারি মেলাপ্রাঙ্গণে বাংলাদেশ দিবস পালন করা হয়। এবারে ১২ দিনের মেলায় মেলা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় ২ কোটি মানুষ যোগ দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের স্টলগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় ছিল। রেকর্ড পরিমাণ দর্শনার্থী মেলায় আসেন। শেষ দিনে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনার অফিস থেকে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিল ‘জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধু ও সোনার বাংলার স্বপ্নের বাস্তবায়ন’। এখানে বক্তব্য রাখেন কে এম খালিদ, বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। বাংলাদেশের জ্ঞান ও  সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির আরিফ হোসেন আর পশ্চিমবঙ্গের পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিলেডর সভাপতি ত্রিদিপ কুমার চট্টোপাধ্যায় ও বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পরিচালক মিনার মনসুর।

আগামী বছর আন্তর্জাতিক বইমেলার মূল থিম ‘বাংলাদেশ’। এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ গিলেডর সভাপতি ত্রিদিপ কুমার চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কি আমন্ত্রণ জানানো হবে? ত্রিদিপবাবু একটু মৃদু হেসে বলেন, আমার তো তাই ইচ্ছে। আগামী বছর শেখ হাসিনাকে দিয়ে মেলার উদ্বোধন করাতে। তবে আমরা গিলেডর পরিচালক হলেও সবকিছু নির্ভর করে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। বিষয়টি তিনি ধোঁয়াশায় রেখে দিয়ে বলেন, আমাদের আশা আমরা আগামী বইমেলায় শেখ হাসিনাকে আনতে পারব।

বইমেলায় বিভিন্ন সেমিনারের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল—ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ডামাডোল বিশেষ করে নাগরিকত্ব বিল। এই আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন বিখ্যাত লেখক আশীষ নন্দী। নাগরিকত্ব বিল দিয়ে আর একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন ভারতের সাবেক বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শশী থারু এবং অপর্ণা সেন একদা ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রধান শ্রীমতী সুজাতা সেন প্রমুখ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাসংগ্রামের সেমিনারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মেজর আরেফিন, ত্রিদিপ চট্টোপাধ্যায়, ফটোজার্নালিস্ট তারাপদ চট্টোপাধ্যায় ও বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র নিয়ে লেখা ‘মিড নাইট ম্যাসাকার’ গ্রন্থের লেখক শ্রী সুখরঞ্জন দাশ গুপ্ত (এই লেখার লেখক)।

এবারে সদ্যসমাপ্ত কলকাতা বইমেলা ঘটনাবহুল বলা যায়। কলকাতার বইমেলার জন্য ভারত সরকারের ডাক বিভাগ একটি স্পেশাল কভার প্রকাশ করে। সোমবার মেলা প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে সেই কভার প্রকাশের জন্য উপস্থিত ছিলেন ডাক বিভাগের পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের চিফ পোস্টমাস্টার জেনারেল গৌতম ভট্টাচার্য, কলকাতা সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল অমিতাভ সিং, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিলেড সভাপতি ত্রিদিপ চট্টোপাধ্যায় এবং সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু শেখর দে-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। ত্রিদিপবাবু বলেন, এত বছর পর কালকাতা বইমেলা প্রথমবার এমন স্বীকৃত হলো। এটা ছিল তাদের কাছে গর্বের বিষয়। সুধাংশুবাবু দাবি করেন, ডাক বিভাগ যেমন স্পেশাল কভার উন্মোচন করে বইমেলাকে সম্মানিত করল, তেমনি তারা যদি মেলার মাঠ থেকে স্পিড পোস্টে বই বাইরে পাঠানোর সুবিধা করে দেন তাহলে আরো ভালো হয়। গৌতম ভট্টাচার্য বলেন, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলা। এত বড়ো মেলাটিকে এতদিনে স্বীকৃত দিতে পেরে তারা গর্বিত। তার দাবি, ডাক বিভাগ নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে এই কভার প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে গৌতমবাবু বলেন, মেলার মাঠ থেকে স্পিড পোস্টে বই পাঠানোর সুবিধা তারা ইতিমধ্যে চালু করেছেন।

এবারের সদ্য সমাপ্ত কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার নানারকম অফারের সঙ্গে ছিল রাজনীতির গন্ধও। তাই বইমেলা অন্যদিক থেকে একটু বোধহয় জমজমাট ছিল। যেমন, ‘রান্নার বই কিনুন আর ফ্রিতে পান সরষের তেল’। বইমেলার মাঠে একটি স্টলের সামনে টুলে বসে একনাগাড়ে এই আবেদন করে চলেছিল এক যুবক। তার অফারে সাড়াও পড়ছিল ভালো। যে স্টল থেকে এই আবেদন ভেসে আসছিল অনেকেই সেখানে ঢু মেরে চাক্ষুস করছিলেন সত্যিই সরষের তেল পাওয়া যাচ্ছে কি না। যখন সরষের তেল ফ্রিতে পাওয়ার জন্য মানুষের ছোটাছুটি ঐ স্টলের দিকে, ঠিক তখনই মাঠের মাইকে প্রচারিত হচ্ছিল আরো একটি ফ্রি অফার। ১ হাজার টাকার বই কিনলে ফ্রিতে পাওয়া যাবে ২৫ হাজার টাকার বই। এখানেই শেষ নয় ফ্রি-র হাতছানি। মাঠের মধ্যে কয়েকজন যুবক-যুবতি বইপ্রেমীদের পাকড়াও করছিলেন। একটি কার্ডে নাম আর ফোন নাম্বারটুকু দিলেই তিনিও জিততে পারেন ফ্রি গিফট। কপাল ভালো থাকলে নিখরচায় মালয়েশিয়া বা সুমাত্রা যাওয়া কোনো ব্যাপারই নয়, এমনই আশ্বাস দিচ্ছিলেন ঐ যুবক-যুবতিরা। মাগনায় এত কিছু প্রাপ্তিযোগের হাঁকডাক রীতিমতো গমগম করছিল মেলা প্রাঙ্গণ। মেলার শেষ দিনটিও উপচে পড়া ভিড়ে বইমেলা ছিল সরগরম।

বইমেলাতে শেষ দিন এসেছিলেন কিছু কলেজপড়ুয়া। এদের মধ্যে একজন জানান, শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় তার প্রিয় লেখক। লেখকের পুরোনো লেখাগুলো একত্রে পাওয়া যায় কি না সেই সন্ধানে তিনি ঘুরছেন। তার মতে, বইমেলা শুধু বইপ্রেমীদের জন্যই নয়, নতুন নতুন পাঠকের আগ্রহ তৈরি করার জন্যও বইমেলা বড়ো ভূমিকা পালন করে। আর একজন জানালেন, নতুন লেখকদের বই তিনি কিনেছেন, যদি পড়ে  ভালো লাগে তবে কলেজস্ট্রিটে গিয়ে হয়তো ঐ লেখকের অন্য বইয়ের সন্ধান করবেন। তবে এ বছরের বইমেলায় পরিবেশের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত মেলাপ্রাঙ্গণকে সম্পূর্ণভাবে প্লাস্টিকমুক্ত রাখা যায়নি। তবে পরবর্তী বইমেলায় শুধু প্লাস্টিক নয়, রাজনীতিকেও মেলা প্রাঙ্গণের বাইরে রাখা হবে বলে এমনই আশাবাদী উদ্যোক্তরা।

বাংলাদেশের স্টলগুলোতে হুমায়ুন আজাদের বইগুলোর চাহিদা ছিল খুবই বেশি আবার মোস্তফা কামালের বইও বেশ কিছু বিক্রি হয়েছে। কলকাতার বড়ো বড়ো পাবলিশার্সের বক্তব্য হলো নতুন বইয়ের থেকে বেশি চাহিদা ছিল রবীন্দ্রনাথ, শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আধুনিক যুগের সমরেশ মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি প্রখ্যাত লেখকদের বই।

যা-ই হোক, আগামী বছর অপেক্ষা করতে হবে আবার বইমেলার জন্য।

n লেখক : পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক