আট কারণে নাছির বাদ

আগামী ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আ জ ম নাছির উদ্দীন আট কারণে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণগুলো হলো, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার মঞ্চ থেকে প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে নামিয়ে দেওয়া, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল জিইয়ে রাখা, অর্ধশতাধিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কোনোটিরই ঠিকঠাকভাবে দায়িত্ব পালন না করা, নগর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব ও স্নায়ুদ্বন্দ্ব, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন না হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এবং দল থেকে সরকারকে আলাদা করা। এসব কারণে হেভিওয়েট প্রার্থী,   ওয়ার্ডে প্রভাব, নিজস্ব বলয় সৃষ্টি, ওপরমহলের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকার পরও নৌকার মনোনয়ন পেলেন না বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

গত কিছুদিন ধরেই কানাঘুষা চলছিল, নাছিরের হাতেই কি থাকবে নৌকার হাল, নাকি নতুন কেউ? এমতাবস্থায় শেষ পর্যন্ত নতুনেই ভরসা খুঁজল ক্ষমতাসীন দলটি। নাছিরের জায়গায় দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলো মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরীকে। একই সঙ্গে পাঁচটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে অগ্রাধিকার পেয়েছে জনপ্রিয়তা। একাধিক মাঠ জরিপের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়। জানা গেছে, শনিবার দলের সংসদীয় বোর্ড পাঁচ সংসদীয় আসন ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে পাঁচ পর্বে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকারও নেন। 

২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটির সর্বশেষ নির্বাচনে প্রায় ২ লাখ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির এম মনজুর আলমকে হারান আওয়ামী লীগের আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনিসহ এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ২০ জন। তাদের মধ্য থেকে ১৬ জনকে শনিবারের মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে ডাকা হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা সবাই মিলে একক প্রার্থী নির্বাচন করলে আমাদের আর বসতেই হতো না।’ এ সময় বোর্ডে থাকা দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এটা বিউটি অব ডেমোক্রেসি।’ তবে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা সাংগঠনিক দুর্বলতারও একটি লক্ষণ।’ চট্টগ্রামের প্রতি তার দুর্বলতার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে নতুন প্রার্থীকে স্বাগত জানিয়েছেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

মহিউদ্দিনের স্ত্রীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার দিন যা ঘটেছিল

হাসিনা মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। গত অক্টোবরে নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত প্রতিনিধি সভার মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বাধ্য করা হয় তাকে। একই সঙ্গে আরো দুই নেতা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম এবং নগর আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক আহমেদুর রহমান সিদ্দিকীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্ত অমান্য করে তারা মঞ্চে ওঠেন বলে দাবি মেয়র নাছিরের। এ নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মেয়র নাছির। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘটনার সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন না। মঞ্চে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশাররফ হোসেন, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামিম ছাড়াও একাধিক এমপি, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা। এতে বিব্রত হন নেতারা। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মহিউদ্দিন ও নাছির গ্রুপের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল রাজনীতিতে আসেন। কিন্তু নওফেল বাবার অনুসারীদের নিয়ে বিরোধে না গেলেও সেই বিরোধ মেটাতে ব্যর্থ হন আ জ ম নাছির। এমতাবস্থায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী রেজাউল করিম চৌধুরী বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির ‘বিরোধীদের’ একক প্রার্থী হয়ে উঠেছিলেন। নাছিরবিরোধীদের একটাই দাবি ছিল, পরিবর্তন চাই। তাই নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতেই ক্লিন ইমেজের রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেছে নেয় মনোনয়ন বোর্ড।

কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্তে মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক ১৯ ফেব্রুয়ারি

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে দলের সমর্থনের জন্য আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন ৪০৫ জন। কাউন্সিলর পদে দল সমর্থিত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টায় আবার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রামে সিটি নির্বাচনে মোট ওয়ার্ড ৪১ এবং সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড ১৪টি।