মো. শফিকুল ইসলাম নিয়ামত
বর্তমান কালে তরুণ প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই দেশের প্রতি অনীহা খুঁজে পাওয়া যায়। তারা প্রায় সব ক্ষেত্রে দেশের বিপরীতে বিদেশকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। তাদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, দেশে তৈরি পণ্যের চেয়ে বিদেশে তৈরি পণ্যের মান ভালো। নতুন কোনো প্রযুক্তি কারখানা গড়ে উঠলে সেটাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে কার্পণ্য করে না। বিশ্বসেরা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিদেশিদের আস্থা থাকলেও, আমাদের তরুণদের গতানুগতিক বিদেশি পণ্য চাই। প্রযুক্তি পণ্য উত্পাদনে এখন আমাদের দেশ ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। এই প্রযুক্তি পণ্যের একটা বড়ো অংশ তরুণদের উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয় কিন্তু এখানেও দেশকে সহায়তার বদলে বিদেশকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। শিক্ষা খাতের কথা তো অবর্ণনীয়। বাংলাদেশে নাকি কোনো মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তাই ধনীর দুলালরা বিদেশে পাড়ি জমায়। আবার মধ্যবিত্তদের মধ্যে যারা এ দেশের আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠে, তারা এ দেশের মধ্যে থাকে বটে কিন্তু হা-হুতাশ করে। অথচ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন মেধাবীদের তৈরি করে দেয়, তখন এই মেধাবীদের ছোঁ মেরে নিয়ে যায় বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা বা চাকরির ক্ষেত্রগুলো। আর আমাদের তরুণরাও বগল চাপড়িয়ে তাদের ডাকে সাড়া দেয়। দেশ যে তাকে এত কিছু দেয় বিনিময়ে দেশকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে বিদেশে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই দেয় না। অর্থাত্ দেশকে সংস্কার করা, সমাজকে পরিবর্তন করা যে তার নৈতিক দায়িত্ব—এটা সে বুঝতে চায় না। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দিই, তাহলে আমরা এটাই আবিষ্কার করতে পারি যে, তাদের দেশের এত সমৃদ্ধি, সুনাম এবং গতিশীলতা অথবা নতুন নতুন উদ্ভাবন সবই তরুণদের হাত ধরে। তরুণদের দক্ষতা এবং মেধাকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে এবং নতুন উদ্ভাবনীতেও কাজে লাগাচ্ছে। তবে আমাদের দেশের আরেকটি গুরুতর যে সমস্যা সেটি হচ্ছে আমরা তরুণদের নিয়ে কাজ করতে বেশি আগ্রহী নই। এই ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে জাতীয়ভাবে তরুণদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে।
কিছুদিন আগে পত্রিকায় একটা রিপোর্ট দেখলাম। আমাদের দেশের বহুজাতিক কোম্পানির বড়ো বড়ো পদগুলোতে নাকি বিদেশিদের আনাগোনা বেশি। কারণ হিসেবে তারা তরুণদের অদক্ষতাকে দায়ী করেছে। বিষয়টাকে একেবারে হালকা করে না দেখে গভীরভাবে দেখলে তাদের যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আমাদের দেশের তরুণ যারা উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করে, তাদের বিদেশে ঠাঁই হয়, এটা আগেই বলেছি। বাকি যারা দেশে থাকে, তাদের অধিকাংশের দক্ষতা এবং যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। সংগত কারণেই দেশের একটা বড়ো অর্থ বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের এই সোনার দেশকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে তরুণদের ভূমিকা অপরিহার্য। দেশের প্রতি তাদের যে বিপরীত ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, সেটাকে আর গাঢ় হতে দেওয়া যাবে না। বর্তমান সরকার তরুণদের মেধাকে কাজে লাগানোর স্বার্থে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। দেশের প্রতি মনোযোগ ও ভালোবাসা সৃষ্টির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাদের কানে বাজাতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার বাণী তাদের শোনাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য তাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। একটি স্বাধীন জাতি হয়ে পরনির্ভরতা কাটিয়ে স্ব-নির্ভরতা অর্জনের দিক উন্মোচনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মযজ্ঞ হাতে নিতে হবে। তরুণরা দেশের প্রতি মনোযোগী হয়ে দেশপ্রেমের অনুভূতি নিয়ে কাজ করলে খুব দ্রুত বাংলাদেশ উন্নত দেশের সারিতে নাম লেখাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়