আসছে রক্তে লেখা একুশ

ফারহানা নওশিন তিতলী 

বাংলা আমাদের রাষ্ট্র ভাষা। বাংলা ভাষা অর্জনের পথটা মসৃণ ছিল না। এর পেছনে রয়েছে অনেক পরিবারের হূদয়বিদারক ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার মানুষের আত্মত্যাগমূলক নানা ইতিহাস রয়েছে। দেশের স্বার্থে বাঙালি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে পিছপা হননি। মা যে ভাষায় কথা বলতে শিখিয়েছেন, কীভাবে সেই ভাষাকে ভুলা যায়? এই প্রেক্ষাপট থেকেই ভাষা আন্দোলনের শুরু। বাংলার মানুষের মায়ের প্রতি যেমন ভালোবাসা—নিজ দেশের, ভাষার প্রতিও ঠিক ততটাই ভালোবাসা। এই ভালোবাসার জন্য বাঙালি জাতিকে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়েছে। 

নিখিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক পন্থায় পূর্ব বাংলায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২ সেপ্টেন্বর ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক ও ছাত্রের উদ্যোগে ‘তমুদ্দুন মজলিস গঠনের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয় এবং সে আন্দোলনে চূড়ান্ত সফলতা আসে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। মায়ের ভাষাকে রক্ষার জন্য রাজপথে আন্দোলন হয়। পাকিস্তানি সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ দান করে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। সালাম-বরকত-রফিক-শফিক-জব্বার আরো কত নাম না-জানা শহিদের আত্মত্যাগে আমরা ফিরে পাই আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ভাষা শহিদেরা ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা-তপ্ত রক্ত ঢেলে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। সেদিন তাদের আত্মদানের ফল হিসেবে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। তাই ভাষা আন্দোলন জাতীয় জীবনে এক অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। জাতিসত্তার বিকাশে ভাষা আন্দোলনের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। একুশ আমাদের গর্ব, একুশ আমাদের অহংকর। শুধু বাঙালি জাতির নয়, একুশ এখন আধুনিক বিশ্বের বিপন্ন ভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার উত্স। 

একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রাণ দেওয়া জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য সাফল্য বয়ে আনে ১৯৯৯ সালে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি বিশ্বদরবারে এনে দিয়েছে এক বিশাল খ্যাতি। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্ব জুড়ে অমর একুশের উদ্যাপন নিঃসন্দেহে এক বিশাল জাতীয় গৌরব ও সম্মানের। ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে।

যে ভাষার জন্য প্রাণ দিলেন বাঙালির আদর্শ ছেলেরা সে ভাষার যথাযথ ব্যবহার করা আমাদের প্রত্যেক বাঙালির কর্তব্য। বর্তমান সময়ে আমরা প্রত্যেকে ইংরেজি ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ছি। আধুনিক সময়ের আধুনিকায়নটা ইংরেজিতে কে কত ভালো কথা বলে তার ওপর নির্ভরতা চলে আসছে; কিন্তু আমরা একবারের জন্যও ভাবছি না যে, আমাদের মাতৃভাষা অর্জনের পেছনের আত্মত্যাগের ইতিহাসটি কত তাত্পর্যপূর্ণ। ইংরেজিতে অনর্গল যে কথা বলছে তাকে বাহবা জানাচ্ছি। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ার কারণে চাকরি বা বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ইংরেজি ভাষা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু সেটা বাংলা ভাষাকে ভুলে গিয়ে নয়। ব্যতিক্রম ব্যতীত আমাদের তরুণ সমাজের বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ খুব কম লক্ষ্য করা যায়। এমন তরুণ সমাজের জন্য তো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ আরো অনেকে তাদের আপামর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের কথা ভুলে গিয়ে তাদের জীবন বিলিয়ে দেননি। যেখানে শুধু আমরা বাঙালি জাতি না, আন্তর্জাতিক ভাবে মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃত—সেই ভাষা ও ভাষা দিবসের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমাদের তরুণ সমাজের উচিত বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা ও বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার করা।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া