দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ইদানিং তাকে হঠাত্ দেখে চেনা দায়। রাস্তায় হঠাত্ দেখলে ভক্তরাও অচেনা বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন।
ওজন কমিয়ে আরো ছিপছিপে হয়েছেন; ফলে দীর্ঘ মানুষটাকে আরো লম্বা বলে মনে হয়। ছোটো ছোটো করে চুল ছেটেছেন। সবচেয়ে বড়ো কথা চোখ দুটো সেই কৈশোরের মতো চকচকে হয়ে উঠেছে যেন। এই চকচকে চোখেই বললেন, ‘স্বপ্নটা তো দেখছিই। স্বপ্ন দেখছি, এবার যেন সহজে ছিটকে না যাই। এবার লম্বা সময়ের জন্য জাতীয় দলে সার্ভিসটা দিতে চাই।’
এই স্বপ্নটা অনেকদিন ধরেই দেখছেন তাসকিন আহমেদ। সেই ২০১২ সালে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের দুই বছর আগে তাসকিন ‘ইউটিউব সেনসেশন’ হয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষত ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় হয়েছিল তার ছোটো একটা ভিডিও ফুটেজ। ইউটিউবের ভিডিওটায় দেখা যেতো বাংলাদেশি একজন ফাস্ট বোলার বাংলাদেশের মরা উইকেটে বুলেটের মতো বল ছুঁড়ছেন। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ব্যাটসম্যানরা রীতিমতো খাবি খাচ্ছেন সেই বোলিংয়ের সামনে।
সেটা ছিল বড়ো দৈর্ঘ্যের ম্যাচে যুবদলের হয়ে তার বোলিং। তবে পৃথিবী যে তথ্য জানতো না, তা হলো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই যুবদলের সিরিজেই হাঁটুতে একটা ব্যথা পেয়েছিলেন। ফলে দীর্ঘায়িত হয়েছিল তার টেস্ট অভিষেক এবং প্রায় তিন বছর খেলতে পারেননি তিনি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। ২০১৪ সালে জাতীয় দলের হয়ে সীমিত ওভারের ম্যাচে অভিষেক হয়েছে তাসকিনের। কিন্তু একটার পর একটা ইনজুরি তাকে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতে দিচ্ছিল না। ফলে টেস্ট অভিষেকও হচ্ছিল না। অবশেষে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটন টেস্টে অভিষেক হয় তাসকিনের। সে বছরই কার্যত এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট ও ওয়ানডে খেলে ফেলেছেন। এরপর ২০১৮ সালের মার্চে টি-টোয়েন্টি খেললেও ইনজুরি সেই থেকে আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে দেয়নি তাকে। অবশেষে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘোষিত টেস্ট দলে ঢাক পেলেন তাসকিন। বিসিএল ও এনসিএলে দারুণ বোলিং করে নিজেকে ফিরিয়ে এনেছেন স্রোতে। ফলে আবার স্বপ্ন দেখছেন টেস্ট ক্যারিয়ারটা লম্বা করার।
তাসকিনের কাছে টেস্ট ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ আছে যে, বাংলাদেশের অনেক ফাস্ট বোলার টেস্ট খেলা উপভোগ করেন না। কিন্তু তাসকিনের কাছে এটাই সবচেয়ে আনন্দের ফরম্যাট, ‘ক্রিকেট তিন ফরম্যাটই ভালো লাগে। কিন্তু টেস্টে ভালো করতে পারলে সব ফরম্যাটে ভালো করা যায়। এখানে নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করার সুযোগ আছে। লম্বা সময় বোলিং করে অনেক কিছু শেখা যায়। এটাই সেরা ফরম্যাট।’
অবশ্য তাসকিনের এমন বাইরে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। ২০১৮ বিপিএলেই ফিরেছিলেন দারুণ ছন্দে। তাকে নিয়েই বিশ্বকাপ পরিকল্পনা হচ্ছিল। কিন্তু ঐ বিপিএলের শেষ দিকে আবার ইনজুরিতে পড়ে নিউজিল্যান্ড সফর মিস করেন। পরে বিশ্বকাপেও তাকে দলের বাইরে রাখা হয়। ইনজুরি এভাবে তার সারাটা ক্যারিয়ারেই দাগ কেটে গেছে। এ নিয়ে দুঃখ থাকলেও খুব একটা আফসোস করেন না এই তরুণ, ‘ইনজুরি তো নিয়ন্ত্রণ করার কিছু নেই। হ্যাঁ, ফিটনেস ভালো রাখলে ইনজুরি কম হতে পারে। সেই চেষ্টা করছি। ইদানিং ফিটনেস বাড়ানোর জন্য দুইবেলা পরিশ্রম করছি।’
সর্বশেষ যখন জাতীয় দলে খেলেছিলেন, তারপর থেকে অনেক কিছু বদলে গেছে। তাসকিন এই সময়ে বাবা হয়েছে, আরো দায়িত্বশীল হয়েছেন। পবিত্র হজ করে এসেছেন। নিজে বলছিলেন, জীবন অনেক বদলে গেছে। আর এই পরিবর্তনটা ক্রিকেটেও পড়বে বলে তার বিশ্বাস।