চিকিত্সায় শিশু ক্যানসার নিরাময় সম্ভব। অনেকেই মনে করে ক্যানসার ভালো হয় না, কিন্তু শিশুদের ক্যানসার নিরাময়যোগ্য। তবে বাংলাদেশের শিশু ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে চিকিত্সার আওতায় আছে মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ চিকিত্সার বাইরে। উচ্চ আয়ের দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত ৮০ শতাংশের বেশি শিশুর ক্যানসার নিরাময় করা হয়। আর মধ্য এবং স্বল্প আয়ের দেশে এই হার ২০ শতাংশের বেশি নয়। তবে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ, সার্জারি ও রেডিওথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিত্সা নিশ্চিত করতে পারলে শিশু ক্যানসার নিরাময় সম্ভব। অন্যদিকে রোগ নির্ণয়ে ভুল বা বিলম্ব, মাঝপথে চিকিত্সা ছেড়ে দেওয়া, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও সেবা না পাওয়ার কারণে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত রাষ্ট্রে ক্যানসারে আক্রান্ত ৯০ শতাংশ শিশুই চিকিত্সায় সুস্থ হচ্ছে। তারা বলছেন, গবেষণায় শিশু ক্যানসারের কারণগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। তবে জানা গেছে, শিশুদের মধ্যে পরিবেশগত কারণে খুব কম ক্যানসার বা জীবনধারা বিষয়ক কারণে ক্যানসার হয়। তবে কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ শিশু ক্যানসারের ঝুঁকির কারণ এবং স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রকোপ বেশি। ২০১২ সালের আগে দেশে কত সংখ্যক ক্যানসার আক্রান্ত শিশু রয়েছে তার কোনো তথ্য ছিল না। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে আমেরিকা ও কানাডা ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালের সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিভাগ চালু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বড়োদের মতো শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ ক্যানসার। শূন্য থেকে ১৯ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রতি বছর নতুন করে ৩ লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর হার চার গুণ বেশি। কারণ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব করা হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষে চিকিত্সা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অভাব তো রয়েছে। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যানসারে শিশুমৃত্যুর হার ৬০ ভাগ কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেটি নিশ্চিত করতে পারলে কমপক্ষে ১০ লাখ শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।
ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যানসারের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর ৩ লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। আর এর মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই আক্রান্ত হয় শতকরা ৮০ ভাগ। এখানে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের বেঁচে থাকার হার মাত্র ৫ ভাগ। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলোয় এই হার শতকরা ৮০ ভাগ। সংস্থাটির তথ্য মতে, বর্তমানে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ ক্যানসার আক্রান্ত শিশু রয়েছে।
বিএসএমএমইউয়ের শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামাল বলেন, ক্যানসার কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। চিকিত্সা নিয়ে অনেক শিশু ক্যানসার রোগী সুস্থ আছে। মানুষের মধ্যে শিশু ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সবাইকে জানানো যে, শিশু ক্যানসার নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। নিয়মিত চিকিত্সা নিলে এ থেকে মুক্তি সম্ভব। তবে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, আমাদের হয়তো স্থানের অভাব রয়েছে, প্রয়োজনীয় ওষুধ আমরা পর্যাপ্ত পাই না—এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে আমরা আরো ব্যাপকভাবে কাজ করতে পারব।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোর্শেদ খসরু বলেন, ২০১৯ সালে এই হাসপাতালে মোট ৫৬৭ জন শিশু ক্যানসার রোগী ভর্তি হয়। এদের মধ্যে নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে ১৬৮ জন, যা কি না শতকরা ৩০ শতাংশ। বেশির ভাগ শিশুর ক্যানসার নিরাময়যোগ্য। শনাক্ত করতে পারলে এবং উন্নত চিকিত্সা পেলে ৭০ শতাংশ রোগী সেরে ওঠে।