উহানে হাসপাতাল পরিচালকের মৃত্যু

চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের একটি হাসপাতালের পরিচালক করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মারা গেছেন। নতুন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল উহান। সেখানকার উচাং হাসপাতালের পরিচালক লিউ ঝিমিং (৫১) গতকাল মঙ্গলবার মারা যান। তার মত্যুর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। চীনের রাষ্ট্রীয় টিভি জানিয়েছে, চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে লিউ ঝিমিংয়ের মৃত্যু হয়। 

চীনা কর্তৃপক্ষ গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশটির ছয় জন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন। আর সংক্রমিত হয়েছেন ১ হাজার ৭১৬ জন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিত্সা দিতে গিয়ে তারাও আক্রান্ত হন। দেশটিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কোনো হাসপাতালের পরিচালকের মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম জানা গেল। লিউ ঝিমিংয়ের মৃত্যুতে চীনের লোকজন শোকাহত। লিউ ঝিমিংয়ের আগে উহানে লি ওয়েনলিয়াং নামের এক চিকিত্সকের মৃত্যু আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। করোনা ভাইরাসের বিষয়ে অন্যদের প্রথম সতর্ক করার চেষ্টা করছিলেন লি ওয়েনলিয়াং। 

উহানে গত ডিসেম্বরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। এই ভাইরাসের সংক্রমণে কোভিড-১৯ রোগে প্রথম রোগী মারা গিয়েছিল গত ৯ জানুয়ারি। এই তথ্য জানানো হয়েছিল ১১ জানুয়ারি। এরপর থেকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমিত রোগী মরছেই। চীনে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত নতুন এই করোনা ভাইরাসে ১ হাজার ৮৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে; আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭২ হাজার ৪৩৬ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছে বলেও নিশ্চিত করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। এদিকে চীনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে সিনহুয়া গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, নতুন করে ৯৮ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ১ হাজার ৮৬৪ জন। এছাড়া নতুন করে আরো আক্রান্ত হয়েছে ১৮৮৬ জন।       

বয়স্ক ও অসুস্থরাই বেশি ঝুঁকিতে

উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ এবং অন্যান্য রোগে ভোগা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি বলে চীনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের করা এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দেশটির সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিসিডিসি) কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে এ গবেষণাটি করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হুবেই প্রদেশের রাজধানী থেকে চীনের অন্যান্য শহর ও দুই ডজনেরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়া নতুন ভাইরাসটি নিয়ে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বড়ো গবেষণা হয়নি। সিসিডিসির গবেষণার প্রাথমিক ফলে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশের দেহেই সংক্রমণের মাত্রা ‘মৃদু’; বৃদ্ধ ও অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এমনকি আক্রান্তদের চিকিত্সায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির মাত্রাও তুলনামূলক বেশি। চীনের অন্যান্য অঞ্চলে ভাইরাসটিতে আক্রান্তদের মধ্যে গড়ে যেখানে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে, হুবেইতে তখন প্রতি ১০০ আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে মৃত্যুর হার হচ্ছে ২ দশমিক ৯। সব মিলিয়ে কভিড-১৯ রোগে মৃত্যুর হার ২ দশমিক ৩ শতাংশ বলেও সিসিডিসির এ গবেষণায় উঠে এসেছে। সোমবার চীনের জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত সিসিডিসির এ গবেষণাপত্রে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭২ হাজার ৩১৪ জনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি সংক্রান্ত পরীক্ষার তথ্য স্থান পেয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় চীনকে মাস্ক-গ্লাভস দিল বাংলাদেশ

বাংলাদেশে তৈরি ছয় ধরনের স্বাস্থ্যসামগ্রী চীনে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পাঠাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের হাতে এসব সামগ্রী হস্তান্তর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। দেশে তৈরি এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে হ্যান্ড গ্লাভস, ফেস মাস্ক, মাথার ক্যাপ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সু কভার এবং গাউন। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের কাছে এসব উপকরণ তুলে দেওয়া হয়। চিকিত্সাসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১০ লাখ হ্যান্ড গ্লাভস, ৫ লাখ ফেস মাস্ক, দেড় লাখ মাথার ক্যাপ, হ্যান্ড সেনিটাইজার ১ লাখ, সু কাভার ৫০ হাজার এবং ৮ হাজার গাউন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, চীন সরকারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, চীনের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বন্ধুত্বের জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এসব সামগ্রী পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। 

চিকিত্সাসামগ্রীর জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের প্রতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি, তার উদারতার জন্য আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এটা ঠিক যে আমরা সাময়িক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তবে যৌথ উদ্যোগে এর বিস্তৃতি আমরা ঠেকাতে পারব।

এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে মোমেন বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় চীন ভালো করছে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে তারা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। সেখানে এখনো যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন, তাদের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করছে চীন সরকার। 

করোনা সন্দেহে বাংলাদেশে ভর্তি রোগীরা ভালো আছেন

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, তিন জন চীনা নাগরিকসহ ৭২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। কেউই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন। হবিগঞ্জ ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে যারা ভর্তি আছেন, তারা সবাই ভালো আছেন।