এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন (নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চূড়ান্ত হিসেব)। তরুণ ভোটার অর্থাত্ যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছর এমন ভোটার প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ। যা মোট ভোটারের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। তাই বড় দলগুলোর যেকোনো হিসাব-নিকেশ উল্টে দিতে পারে এই তরুণরা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির মত প্রধান দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহার নিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের তেমন মাথা ব্যথা নেই কারণ আমরা খুব ভালোভাবে জানি নির্বাচনের আগে তাদের এই ইশতেহার ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। তার প্রমাণ বিগত দিনগুলোতে তারা দিয়েছে এখনও দিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তার অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয় না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির ইশতেহার মূলত একটি অপরটির পরিপূরক। তারা প্রধানত বর্তমান সময় আলোচিত সমস্যাগুলোকে ইশতেহারে জায়গা দিয়েছে। এগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে তা ব্যাখ্যা করেনি। কিছু প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হয়েছে যা ভবিষ্যতে আরো সমস্যা তৈরি করবে বলে মনে হয়, যেমন সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা উঠিয়ে দেওয়া, পিএসসি, জেএসসির মত পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ করা, বিভিন্ন আইন বাতিল করা, কোটার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সমাধানের কথা না বলা, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা ইত্যাদি। আবার আওয়ামী লীগ ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ স্লোগানে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তাদের ২১ দফা সম্মিলিত ইশতেহারে তারা জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রেমিটেন্স, এসডিজি, বিদ্যুত্, ব্যবসা-বাণিজ্য, যুব সমাজের উন্নয়ন, বিভিন্ন মেগা প্রকল্পসহ ভবিষ্যত্ এর উন্নয়ন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে এবং সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি? সেটা হয়তো তারা ভুলে গেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার প্রধান কারণ ছিলো বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্য দূর করা এবং গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যা বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ও ৭ মার্চের ভাষণে উল্লেখ করেছেন। অতএব, শুধু উন্নয়ন নয়, গণতন্ত্র ও প্রধান তিন বিভাগের স্বাধীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। আগেই বলেছি ইশতেহার নিয়ে আমাদের তেমন মাথা ব্যথা নাই। তাহলে আমরা কি চাই? আমরা চাই যেহেতু প্রকৃত ক্ষমতার মালিক জনগণ সেহেতু ক্ষমতা হস্তান্তরের দায়িত্ব জনগণের হাতে দেওয়া হোক। তারাই নির্ধারণ করে নিবে প্রকৃতপক্ষে কোনো দল তাদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। আর তার জন্য প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। নির্বাচন বলতে প্রত্যেক ভোটার যেনো তার নিজের ভোট নিজে দিয়ে তার ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পায়। ভোটারদের যেনো কোনো রকম হয়রানির শিকার হতে না হয়। কোনো অপশক্তি যেনো সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে না পারে। হরতালের নামে ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যার মত অপসংস্কৃতির যেনো পুনরাবৃত্তি না হয়। তবে আশার কথা হলো এ বছর অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে তুলনামূলক বেশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যার প্রমাণ ইতোমধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রচার প্রচারণায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে। এসব অতি উত্সাহীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নিবে বলে আশা রাখি। তরুণ হিসেবে কয়েকটি ব্যাপারে আগত সরকারকে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ করব। এসবের মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ বিনির্মাণ, চাকরির পরীক্ষার ফি কমানো, দলীয় সমর্থনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করা, দুর্নীতি দূর করা এবং চলমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখা ইত্যাদ।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়