‘শেখের কিল্লা’র ৪৮ বছর পূর্তি

এ এইচ এম নোমান

পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর সর্বপ্রথম যে গ্রাম থেকে ‘দেশ গড়ার ডাক’ দিতে গেলেন সে গ্রামের নাম চর পোড়াগাছা, ইউনিয়ন : চরবাদাম, থানা : রামগতি, জেলা : নোয়াখালী (বর্তমানের লক্ষ্মীপুর জেলা)। দিনটি ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। শীতের আমেজ ছিল। মনে আছে দুটি হেলিকপ্টারযোগে বঙ্গবন্ধু বাগ্যারদোনা স্রোতহীন মেঘনা ঘেঁষে নতুন গড়ে ওঠা চর কলাকোপা, মৌজা চর পোড়াগাছা পৌঁছেন। সকাল ১০টায় হেলিকপ্টার থেকে বিশাল ব্যক্তিত্ব স্বপ্নমুখী বঙ্গবন্ধু নামতে নামতে চেনামুখ তোফায়েল ভাইসহ আরো অনেকে নেমে এলেন। পুরো নতুন চর জাগা এলাকা জনসমুদ্র। কে কাকে দেখে, সবাইর শ্রদ্ধাভরা তীর চোখ প্রাণপ্রিয় মুক্তির প্রতিকৃতির দিকে। দৃঢ়পায়ে হেঁটে ডান-বাম তাকাতে তাকাতে এক-দুই বার খোলা আকাশের দিকে (আল্লাহর শোকরিয়া) তাকিয়ে তৈরি নতুন স্থাপন করা হোগলা-তেরপাল মোড়ান মাটির কিল্লায় যথাস্থানে দাঁড়ালেন। চতুর্দিক ঘুরে ঘুরে আবাল-বৃদ্ধ-যুব-কিশোর-শিশু মানব সমুদ্রের উত্ফুল্ল মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনির উত্তরে, হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করছিলেন অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিল্লায় দাঁড়িয়ে গগনবিদারী কণ্ঠে কি কি বললেন সব স্মৃতিতে না আসলেও মূল কথাসমূহ মনে আসে যে, ‘দেশ আমাদেরকেই গড়তে হবে, উত্পাদন বাড়াতে হবে, প্রত্যেক বাড়িতে একটি করে গাছ হলেও লাগাতে হবে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে দেশ গড়া ও অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে’।  সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষে কোদাল হাতে নিয়ে স্বহস্তে মাটি কেটে ঝুড়িতে দিলেন। সফরসঙ্গি নেতৃবৃন্দও একে একে সবাই একইভাবে মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এই স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ উদ্বোধন করলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই সঙ্গে ২ কিলোমিটারব্যাপী ওড়া কোদালসহ সোজা লাইন ধরে প্রায় ৪  হাজার স্বেচ্ছাকর্মী মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ী যুবক গায়ে সাদা গেঞ্জি, পরনে প্যাঁচ দেওয়া লুঙ্গি-গামছা পরে রাস্তা বরাবর একই সঙ্গে একই কমান্ডে ঢোল-সহরতের তালে তালে মাটি কেটে রাস্তা বাঁধার কাজ শুরু করে।

যে গ্রাম কিল্লায় দাঁড়িয়ে প্রথম দেশ গড়ার ভাষণ দিলেন, যেখান থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে নিজ হাতে মাটি কেটে নোয়াখালী-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক বাঁধার কাজ উদ্বোধন করলেন, সেই কিল্লাই আজ ‘শেখের কিল্লা’ নামে পরিচিত-সর্বখ্যাত। এই কিল্লাকে ঘিরে ওপাশেই গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ‘গুচ্ছগ্রাম’ যা আজ সারাদেশের ঠিকানা, আদর্শগ্রাম-গুচ্ছগ্রাম-আশ্রয়ণ প্রকল্প নামে ভূমিহীন ছিন্নমূলদের জন্য স্থাপন হচ্ছে বাড়িঘর। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৭০-এর ১২ নভেম্বর সাইক্লোনে বিধ্বস্ত রামগতিতে সমবায়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় উত্পাদন যুদ্ধও চলমান ছিল। এই কিল্লা ঘিরেই নতুন জাগা চরে আলু, সয়াবিন, চিনাবাদাম, সূর্যমুখীসহ নানাজাতীয় শাক-সবজি, তরিতরকারি ফসল প্রদর্শনীমূলক চাষাবাদ করা হয়। ১৯৭২ সালে সমবায়ীদের গড়া চর আলেকজান্ডারে দেশের প্রথম উদ্ভাবনী গুচ্ছগ্রাম ‘বিশ্বগ্রাম’ মেঘনার অতল গহ্বরে চলে গেছে। তিস্থত ‘বিশ্বগ্রাম’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই  শেখের কিল্লার পূর্ব-উত্তর পাশে এসে আশ্রয় নিয়ে শিক্ষার আলোকবর্তিকা এখনো জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

আমরা সবাই যাতে বঙ্গবন্ধু ও তার কীর্তিকে জাগিয়ে রাখতে পারি, তাই আজকের এই দিনের হোক আমাদের প্রত্যাশা। ১৯৭২ সালের ভাষার মাসের ২০ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা। বঙ্গবন্ধুর উত্পাদন উন্নয়ন ডাকের আজ ৪৮ বছর পূর্তি। আমাদের অগ্রগতি ও বিচ্যুতির হিসাব-নিকাশ মূল্যায়নের পালা। সেবা ও ত্যাগের প্রকৃত ইতিহাস ধারণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ়-উঁচুতায় এগিয়ে যাওয়াই আজ আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।

তাই এই অঞ্চলের মানুষের একান্ত আশা, আবেদন—‘শেখের কিল্লা’কে ঘিরে গড়ে ওঠা, আল্লাহর অপার সৃষ্টির জীবনগাথার কলকাকলি ভাঙাগড়ার নদীর খেলাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর ‘প্রথম গ্রাম গমন, ঐতিহাসিক দেশ গড়ার ডাক’কে দেশের জন্য অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য বর্ণিত নির্দিষ্ট শেখের কিল্লা স্থানে ১. একটি স্বপ্ন স্মৃতিস্তম্ভ, ২. পর্যটক রেস্ট হাউজ ৩. স্থানীয় কৃষ্টি-কালচার, একটি পাঠাগার, ৪. তত্কালীন বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার তথা সারা গ্রাম-বাংলার ঐতিহাসিক ‘বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা স্বপ্ন কমপ্লেক্স’ স্থাপন করা  হোক। এরই মধ্যে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ী ও রাজনৈতিক সচেতনদের উদ্যোগে এ মাটি থেকে গড়ে ওঠা বেসরকারি সংস্থা ‘ডর্প’-এর সৌজন্যে ‘শেখের কিল্লা মাইলস্টোন’ স্থাপন করা হয়েছে যা এলাকা ও দেশ-বিদেশের পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে সরকারের ভূমি, স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি, পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণসহ বঙ্গবন্ধুর দেশ গড়ার ডাকের স্মারক স্মৃতি স্বপ্ন কেন্দ্র তৈরির আবেদন রাখছি। প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পদার্পণে ‘গুচ্ছগ্রাম’ স্থাপন স্মরণে, ইউনিয়নভিত্তিক ৫০০ নদীভাঙা অসহায় গরীব পরিবারের জন্য সুউচ্চ প্রাসাদ সম্পন্ন সামগ্রিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পাইলট আবাসন গ্রাম স্থাপন করার আহ্বান জানাই।

৪৮ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এদিন রামগতিতে ‘শেখের কিল্লা মাইলস্টোন’ পাদদেশে মুক্তিযোদ্ধা, সমবায়ী, ছাত্র-শিক্ষক, স্কাউট, কৃষক, জেলে, জাতীয় ও স্থানীয় মিডিয়াসহ সবাই মিলে সর্বজনীন কর্মসূচি পালন করা হবে।

n লেখক :গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার বিজয়ী-২০১৩