বাবানের বয়স সাত বছর। থাকে গুলশানের বনেদি এলাকার পুরোনো ধরনের বাড়িতে। বাড়ির পিছন দিকে বিশাল বাগান। বাগানে নানা রকমের ঝোপঝাড় আর ফুলের গাছ। হাসনাহেনা ঝোপের কাছে ওড়াউড়ি করছে দুটো টুনটুনি পাখি। বাবান তার মাকে বলল, মা টুনটুনি পাখি দুটো ওখানে বাসা বাঁধবে। তিনটা ডিম পাড়বে। তবে তিনটা ডিম থেকে তিনটা ছানা হবে না। হবে দুটো। একটা ডিম নষ্ট হয়ে যাবে। মা প্রথমে অবাক হলেন, তারপর হেসে ফেললেন। তুমি এসব জানলে কী করে? বাবান বলল, আমি টুনটুনি পাখিদের ভাষা বুঝতে পারি। মা আর কিছু বললেন না। ভাবলেন এই বয়সি শিশুরা তো কত রকমের কথাই বলে। সে কথা ধরে বসে থেকে লাভ কী? কিন্তু কয়েকদিন পর দেখা গেল, টুনটুনি পাখি সত্যি বাসা বেঁধেছে হাসনাহেনার ঝোপে এবং তিনটি ডিম পেড়েছে। কয়েক দিন পর দেখা গেল ছানা হয়েছে দুটো। বাবান মাকে বলল, দেখেছ মা আমার কথা মিলেছে কিনা! মা বললেন, হ্যাঁ মিলেছে বাবা। বাবানের বাবাকেও এ কথা জানালেন তিনি। টুনটুনি ছানা দুটোর নাম রেখেছে বাবান। এক জন টুনু আর এক জন টুনি। আশ্চর্য ব্যাপার, বাসার কাছে গিয়ে ছানা দুটোর নাম ধরে ডাকলে তারা টুনটুন করে বাবানের ডাকে সাড়া দেয়। ছানা দুটো কবে উড়তে শিখবে বাবান সে কথা তার মাকে জানাল। দেখা গেল বাবানের এই কথাটাও মিলে গেছে। উড়তে শেখার পর যখন তখন ছানা দুটো বাবানের কাছে আসে। গভীর বন্ধুত্ব হয়েছে তাদের। বাবান তাদের ভাষা বোঝে, টুনটুনি ছানা দুটো বোঝে বাবানের ভাষা। চার, পাঁচ থেকে ১০, ১১ বছরের শিশুদের জন্য আমি বাবান সিরিজের লেখাগুলো লিখতে শুরু করেছি। এবার লিখেছি পাঁচটা বই। ১. বাবান ও টুনটুনি পাখি ২. বাবান ও তার বিড়ালছানা ৩. বাবান ও দশটি কাক ৪. বাবান ও তার কুকুর ছানা ৫. বাবান ও একটি চড়ুইছানা। ঐ বয়সি শিশুদের কথা মনে রেখে তাদের উপযোগী অতি সহজ ভাষায় লেখাগুলো লিখেছি। ধ্রুবএষ অত্যন্ত চমত্কার প্রচ্ছদ ও ছবি এঁকেছেন। ‘অনন্যা’ প্রকাশনী বের করেছে প্রথম তিনটি বই। পরের দুটো বের করেছে ‘পুথিনিলয়’। প্রতিটি বইয়ের দাম ১৩৫ টাকা। বইমেলার কমিশন বাদ দিলে ১০০ টাকা। অর্থাত্ ১০০ টাকার একটা নোট দিয়ে একটি শিশু একটি বই কিনতে পারছে।
এই বয়সি শিশুদের জন্য তেমন লেখা হয় না। আমাদের শিশুরা প্রকৃতি পরিবেশ ফুল পাখি প্রজাপতি, আকাশের চাঁদ ও বৃষ্টি, সূর্য তারা, নদী সমুদ্র পাহাড় বন আর জীবজন্তু নিয়ে তেমন কিছুই জানে না। একটি পাখির ছানা যেমন, একটি ফুলের ফুটে ওঠা যেমন আমি মনে করি একটি মানব শিশুও অনেকটাই তেমন। সকলেই প্রকৃতি সন্তান। এই সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে কোথাও একটা অন্তর্গত মিল আছে। বুঝুক না একটি শিশু একটি পাখির ছানার ভাষা! গভীর বন্ধুত্ব হোক না তাদের মধ্যে! একটু ফ্যান্টাসির আঙ্গিকে লেখা হয়েছে গল্পগুলো। উদ্দেশ্য ছোটোরা যাতে আকর্ষণ বোধ করে।
সেই ১৯৭৩ সালে জীবনের প্রথম গল্পটি আমি ছোটোদের জন্যই লিখেছিলাম। গল্পের নাম ছিল ‘বন্ধু’। বানরের সঙ্গে একটি বাচ্চা ছেলের বন্ধুত্ব নিয়ে লেখা হয়েছিল গল্প। তারপর থেকে নিয়মিত ছোটোদের লেখা লিখে গেছি আমি। কিশোর উপন্যাস সমগ্র বেরিয়েছে তিন খণ্ডে, কিশোর গল্পসমগ্র বেরিয়েছে তিন খণ্ডে। পরের বছর চতুর্থ খণ্ডগুলো বেরোবে। এ বছর কিশোরদের জন্য লিখেছি ‘বাড়িটায় কে যেন থাকে’। প্রকাশ করেছে ‘কথাপ্রকাশ’। শিশু-কিশোরদের লেখা লিখতে বসে বরাবরই আমি চলে যাই গভীর এক আনন্দের জগতে। নিজেও হয়ে যাই তাদের বয়সি।
গত কয়েক বছর ধরে দেখছি শিশু কিশোরদের বইয়ের চাহিদা বেড়েছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মা বাবা, শিক্ষক অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে মেলায় আসেন। তাদের হাতে বই তুলে দেন। এবারের মেলায় এক দিন মিরপুর এগারোর ওদিককার ‘কসমস’ নামের একটি স্কুল থেকে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন তিন জন শিক্ষক। প্রত্যেককে বাবান সিরিজের বই উপহার দিলাম আমি। তাদের সঙ্গে ছবি তুললাম, একটি টেলিভিশন চ্যানেলে লাইভ অনুষ্ঠানে তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কথা বললাম। কী যে আনন্দে কাটল সময়টুকু! এবারের মেলা বিশাল জায়গা নিয়ে, অত্যন্ত পরিপাটি, সুবিন্যস্ত কিন্তু শিশু কর্ণারটি ভালো জায়গায় পড়েনি। কয়েকটি স্টল বাদে বাকিগুলোর সাজসজ্জা তেমন আকর্ষণীয় নয়। ছোটোদের জন্য লেখা বইয়ে স্টলগুলো ভর্তি ঠিকই তবে মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা কম। অনেক বইয়েই যত্নের ছাপ বলতে গেলে নেই। যেনতেনভাবে বই ছাপিয়ে মেলায় নিয়ে আসা হয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক পাঠকদের জন্য লেখা ভুলে ভর্তি প্রচুর বইও আমার হাতে পড়েছে। এ অবস্থা রুখতে না পারলে বইমেলার প্রকৃত সার্থকতা অর্জন করা যাবে না। বিশেষ করে ছোটোদের বইয়ে ভুল থাকলে তা হবে ভয়ংকর। একটি শিশু ভুল বানান শিখবে, ভুল বাক্য শিখবে। লেখক প্রকাশক সবাইকেই আমি অনুরোধ করি, আপনারা দয়া করে এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিন। আমাদের শিশুরা যেন ভুল বই না পড়ে। আমাদের শিশুরা যেন শুদ্ধ, সুন্দর বই পড়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত মানুষ হওয়ার প্রকৃত বন্ধু হচ্ছে ভালো বই।