আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তানের শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে হত্যার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরাজিত শত্রুরা এদেশীয় দালালদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে একাত্তরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল। খুনিদের মধ্যে অনেকেই ছিল, যারা আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করত, আমার মা যাদের রান্না করে খাওয়াতেন- তারাও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। খুনি মুশতাক-জিয়ারা মদত না দিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার নাম পর্যন্ত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সত্য ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না, মিথ্যা দিয়ে কখনো সত্যকে ঢেকে রাখা যায় না—এটাও আজ প্রমাণিত হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মহান ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত আত্মমর্যাদাশীল উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তর পরবর্তী দীর্ঘ ২১টি বছর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদানসহ তার নাম মুছে ফেলার নানা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে কখনো সত্য ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না, এটা আজ প্রমাণিত। বুকের রক্ত দিয়ে যারা আমাদের রক্তের আখরে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন, তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। লাখো শহিদের সেই আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না, বৃথা যেতে আমরা দেব না—এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জনে বীর শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। বাংলাদেশ মানেই তাদের কাছে ছিল দারিদ্র্যপীড়িত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা-জ্বলোচ্ছ্বাস, গরিব দেশ হিসেবে। এখন আর কারো সেসব কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। মাত্র এক দশকেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল, মর্যাদাশীল দেশ। আমরা খাদ্য উত্পাদনে উদ্বৃত্ত, ঘূর্ণিঝড়-বন্যাসহ সব দুর্যোগ মোকাবিলা করতে শিখেছি।
মুজিববর্ষকে সামনে রেখে দলের প্রতিটি নেতাকর্মীকে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুজিববর্ষে আমরা দেশের প্রতিটি ঘর আলোকিত করব। আর সব নেতাকর্মীর ওপর দায়িত্ব হলো—নিজ নিজ এলাকায় কোনো লোক গৃহহারা আছে কি না, তা খুঁজে বের করা। বাংলাদেশের একটি লোকও গৃহহারা থাকবে না। গৃহহীনদের তালিকা তৈরি করুন, প্রত্যেককে ঘর করে দেওয়া হবে। সবার একটা ঠিকানা নিশ্চিত করা হবে।
টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ আমাদের বারবার ভোট দিয়েছে, তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। এটাই সব থেকে বড়ো পাওয়া। আজকে ২০২০ সাল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আমরা উদ্যাপন করতে যাচ্ছি। আমরা আজকে স্বাধীন জাতি। আর সব থেকে সৌভাগ্যের বিষয়, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা উদ্যাপন করছি। যিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। একটা অস্তিত্ব দিয়ে গেছেন। আমাদের ঠিকানা দিয়ে গেছেন। আমাদের আত্মমর্যাদা দিয়ে গেছেন। দীর্ঘ এক দশক ক্ষমতায় থাকার ফলে আজকে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভার শুরুতেই ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়। আলোচনায় অংশ নেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ডেনভারের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক-গবেষক হায়দার আলী খান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, কার্যনির্বাহী সদস্য মেরিনা জামান কবিতা, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, আবু আহম্মেদ মান্নাফী এবং ভাষা শহিদদের স্মরণে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি তারিক সুজাত। আলোচনা সভা যৌথভাবে পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ ও উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে, আজ সারা দুনিয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু দুটি স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতি করেছিলেন, একটি হলো স্বাধীনতা আর একটি অর্থনৈতিক মুক্তি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন আর তার কন্যা শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক মুক্তি দানের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি রাজনীতি এখন দুর্নীতির দায়ে সাজা প্রাপ্ত বেগম খালদা জিয়ার স্বাস্থ্যের মধ্যে আটকে আছে। কোমরের ব্যথায় খালেদা জিয়ার দাঁড়াতে পারছেন না, খালেদা জিয়া অসুস্থ এই হচ্ছে তাদের রাজনীতি। এটার মধ্যেই তারা আটকে আছে।