ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি করেছেন মেডিক্যাল রোবট। এই রোবট মানবদেহে করোনা ভাইরাস শনাক্তসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয় ও সেবাকাজে ব্যবহার করা যাবে। ইনস্টিটিউটের পাঁচ শিক্ষার্থীর বানানো রোবটটি রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ, ইসিজি, হার্টবিট, কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড ও ব্লাড সুগার পরিমাপসহ বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম। এছাড়া চলাফেরা করার সময় সালাম দিয়ে নিজের নাম, দেশের নাম, জাতির জনকের নাম ও প্রধানমন্ত্রীর নাম বলতে পারে ‘মিস্টার ইলেকট্রোমেডিক্যাল’।
ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রোমেডিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান, মো. আনাসুর রহমান, মো. মীর আমিন, মেহেদী হাসান ও ষষ্ঠ ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল মোন্নাফ মাত্র ১৫ দিনে ‘মিস্টার ইলেকট্রোমেডিক্যাল’ বানিয়েছেন। তাদের প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন বিভাগের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (টেক) মো. আবুল কাশেম। শিক্ষার্থীরা তাদের নিজেদের বিভাগের নামেই রোবটটির নাম দিয়েছেন মিস্টার ইলেকট্রোমেডিক্যাল।
রোবটটি বানাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। অর্থের সিংহভাগই জোগান দিয়েছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। আর কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ। গত ৭ জানুয়ারি রোবট বানানোর কাজ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। টানা ১৫ দিন কাজ করে পরিপূর্ণ রোবট বানাতে সক্ষম হন তারা।
গত ২৩ জানুয়ারি রোবটটি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন শিক্ষার্থীরা। মানুষের রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে রোবটটিতে যুক্ত করা হয়েছে বিপি মনিটর, ইসিজি সেনসর পালস অক্সিমেটরি সেনসর, জিসিইউ সেনসর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেনসর ও থার্মাল স্ক্যানার। আর চলাফেরা করার জন্য ক্যামেরা ও আলট্রাসনিক সেনসর লাগানো হয়েছে। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এসব ফিচার ব্যবহারও করা হয়েছে। পালস অক্সিমেটরি সেনসরে আঙুল রাখলেই দেখা যাচ্ছে হার্টবিট ও অক্সিজেনের পরিমাণ। রোবটের হাতে থাকা থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে পরিমাপ করা যাচ্ছে শরীরের তাপমাত্রা এবং রক্তচাপ পরিমাপ যন্ত্র দিয়ে সহজেই জানা যাচ্ছে উচ্চ নাকি নিম্ন রক্তচাপ। এছাড়া জিসিইউ সেনসরের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড, ব্লাড সুগার ও ব্লাড গ্রুপ। মাদকাসক্ত কাউকে শনাক্ত করতে এবং আগুন লাগার খবর দিতে রোবটটিতে নতুন ফিচার হিসেবে অ্যালকোহল ডিটেক্টর ও ফায়ার অ্যালার্ম যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। রোবটটি যে কোনো জায়গা থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মোবাইল অ্যাপস তৈরির কাজও করছে ঐ পাঁচ শিক্ষার্থী।
বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুল হক জানিয়েছেন, সারাদেশের ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মধ্যে শুধু নয়টিতে ইলেকট্রোমেডিক্যাল টেকনোলজি বিভাগ চালু রয়েছে। মূলত এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা মেডিক্যাল-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি করে থাকেন। ২০০৫ সাল থেকে এই বিভাগ চালু হলেও এখনো পর্যন্ত পাশ করে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হয়নি। তাই বেসরকারিভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান ও মো. আনাসুর রহমান জানান, ‘এ ধরনের রোবট দেশে আগে কখনো তৈরি হয়নি। আমরাই প্রথম এটি বানিয়েছি। সাধারণত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, তার সবগুলোই আমাদের রোবট দিয়ে করা সম্ভব। হাসপাতালে ডাক্তার না থাকলেও আমাদের এই রোবট যেন বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, সেজন্য আমরা এটিকে আরো আধুনিক ও উন্নত করার চেষ্টা করছি।’ শিক্ষার্থী আব্দুল মোন্নাফ, মো. মীর আমিন, মেহেদী হাসান জানান, যেহেতু মেডিক্যাল সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ নিয়ে আমাদের লেখাপড়া, সেজন্যই আমরা মেডিক্যাল রোবট বানিয়েছি।
ইলেকট্রোমেডিক্যাল বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান করোনা ভাইরাস ইস্যুতেও মিস্টার ইলেকট্রোমেডিক্যাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে কেউ না গেলেও মিস্টার ইলেকট্রোমেডিক্যালে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে গিয়ে তার শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ, হার্টবিট ও অক্সিজেনের পরিমাণ পরিমাপ করতে পারবে। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে ওষুধ ও খাবার সরবরাহের কাজও করতে পারবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছাত্র-শিক্ষকরা তাদের স্বল্প সামর্থ্যের মধ্যে এই রোবট তৈরি করেছেন। মেডিক্যালের অনেক কাজ এটা দিয়ে করা সম্ভব। যদি কেউ অর্থায়ন করেন, তাহলে রোবটটিকে আরো কার্যকর করা সম্ভব। বিজয়নগর হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আশরাফুল আলম স্বপন বলেন, মিস্টার ইলেকট্রোমেডিক্যাল রোবটটি দেশের চিকিত্সাসেবায় কাজে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম বলেন, ‘মেডিক্যাল রোবটের ধারণাটি আমাদের দেশে একেবারেই নতুন। শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়। যদি এই রোবট চিকিত্সার ক্ষেত্রে কাজে আসে, তাহলে আমরা এটিকে সানন্দে গ্রহণ করব।’