দুই মাসে তিন দফা বাড়ল চালের দাম

কোনো কারণ ছাড়াই সারাদেশের মোকামগুলোতে আবারও চালের দাম বেড়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের দুই মাসে তিন দফা বাড়ল নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম। ফলে বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। চালকল মালিকদের দাবি, আমন মৌসুম শেষ হওয়ায় এখন ধানের দাম চড়া। তাই চালের দাম বেড়েছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, দেশের সবচেয়ে বড়ো চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে সব ধরনের চালের দাম      বেড়েছে। মোকামে গতকাল সোমবার মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও ৫০ কেজি বস্তার দর ছিল ২ হাজার ২৫০ টাকা। ৫০ কেজি বাসমতি চালের বস্তা ২ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭০০ টাকা, কাজল লতা চালের বস্তা ১ হাজার ৮০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০ টাকা হয়েছে। অন্য সব রকম চালের দামও বাড়তি। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।

গতকাল সোমবার রাজধানীর খুচরা বাজারে নাজিরশাইল/মিনিকেট মানভেদে ৫২ থেকে ৬০ টাকা, পাইজাম/লতা মানভেদে ৪৩ থেকে ৫০ টাকা ও ইরি/স্বর্ণা ৩২ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়; যা সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি।

চালকল মালিকরা জানান, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ধানের দাম মণপ্রতি ১০০ টাকা বেড়েছে। ধানের এ বাড়তি দামের কারণে চালের দামও বেড়েছে। তবে চালের ঊর্ধ্বগতির এ লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে বাজারে আরো অস্থিরতা ও সংকট তৈরি হতে পারে বলে ক্রেতা-সাধারণের আশঙ্কা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চালের দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে মিলারদের কারসাজি রয়েছে। কারণ, আমন মৌসুম সদ্য শেষ হয়েছে। দেশের সব মিলেই পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান ও চাল মজুদ রয়েছে। এছাড়া সামনেই নতুন বোরো উঠবে। তাহলে এখন কেন বাড়বে চালের দাম?

এ প্রসঙ্গে ব্যাপারী এগ্রো প্রোডাক্টের স্বত্বাধিকারী তোফাজ্জল হোসেন ব্যাপারী ইত্তেফাককে বলেন, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকারের আমন মৌসুমের ধান-চাল  ক্রয় অভিযান চলছে। ফলে মিলাররা সরকারের গুদামে চাল দিচ্ছে। এজন্য চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। এর সঙ্গে মিলারদের কারসাজির কিছু নেই। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মোটা চালের তুলনায় সরু চালের চাহিদা বেড়েছে। এখন মিনিকেট চালের মৌসুম শেষ পর্যায়ে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমায় সরু চালের দামটা বেশি বেড়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মিল পর্যায়ে কেজিতে ২/৩ টাকা বাড়লে খুচরা ব্যবসায়ীরা আরো বেশি বাড়ায়। অথচ সব দোষ হয় মিলারদের।

এদিকে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে গতকাল চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক। বৈঠকে ধানের ঊর্ধ্বগতি ও ধান সংকটকে চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চালকল মালিকরা উল্লেখ করেন। তবে কোনো অজুহাতে চালের বাজারে যেন অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য চালকল মালিকদের সতর্ক করা হয়। বৈঠকে জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন, পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাজি রবিউল ইসলাম, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনোয়ার হোসেন, অটো রাইস মিলমালিক আবদুর রশিদ, আবদুস সামাদ, ওমর ফারুক, জয়নাল আবেদীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অটোরাইচ মিল মালিক সমিতির কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জানান, ধানের বাড়তি দামের কারণে চালের বাজার কিছুটা বেড়েছে। তবে ধানের বাড়তি দামের কারণে চালের বর্তমান দর সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন জানান, চালের বাজারে যেন কোনোভাবেই অস্থিরতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়েছে। এছাড়া খাজানগর মোকামসহ বিভিন্ন চালের বাজারে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে গত মাসে সাতটি মনিটরিং টিম গঠন করেছে সরকার। ঢাকা মহানগরের বড়ো বড়ো পাইকারি বাজার সরেজমিনে তদারকির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চারটি এবং খাদ্য অধিদপ্তরের অধীনে তিনটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলোকে বাজারদর সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বাজার পরিস্থিতি নিয়ে যে কেউ কন্ট্রোল রুমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ কেন্দ্রের ফোন নম্বর  ০২-৯৫৪০০২৭ এবং ০১৬৪২৯৬৭৭২৭।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। তার পরও চট্টগ্রামে দফায় দফায় বাড়ছে দাম। গত কয়েক মাস পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দেশের চালের বাজার সম্পূর্ণ বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। সামনে আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন পাইকারি বিক্রেতারা। বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) চালের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগ, মিল মালিক ও আমদানিকারকদের মজুতদারির কারণে চালের দাম বাড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ না থাকায় চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রামে বাজার মনিটরিংয়ে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব হলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা মার্কেটিং অফিসার মো. সেলিম মিয়া। বাজার মনিটরিংয়ে এ কমিটির কোনো তত্পরতা নেই। সর্বশেষ কবে মিটিং হয়েছে, সদস্যদের মধ্যে কারো জানা নেই। জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সচিব মো. সেলিম মিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাজারে কোনো জিনিসের দাম হঠাত্ বেড়ে গেলে জেলা প্রশাসক সভা ডেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। কৃষকের কাছে বর্তমানে বিক্রি করার মতো ধান নেই। সরকার ২৬ টাকা দরে ধান ও ৩৬ টাকা দরে চাল সংগ্রহ করছে। অথচ বাজারে ১৫/১৬ টাকা দরে ধান ও ৩১/৩২ টাকা দরে চাল পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রামে অনেকেই কমিশনে চাল বিক্রি করে। মিল মালিকরা যে দর নির্ধারণ করে দেয় সেই দরে বিক্রি করেন কমিশন এজেন্টরা। মিল মালিক খোলা বাজারে চাল বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে। তবে তাদের কাছে প্রচুর চাল মজুত রয়েছে।’