সারা বিশ্বে মাদক একটি গুরুতর সমস্যা হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে। মাদকের বিরুদ্ধে দেশে দেশে যুদ্ধ ঘোষণা করা হইতেছে কিন্তু কোনোভাবেই এই বিপর্যয়কারী সমস্যা হইতে মুক্তি পাওয়া যাইতেছে না। বাংলাদেশেও মাদক একটি অন্যতম সামাজিক সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়াছে। দেশের উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করিতেছে। মাদক দেশের প্রাণশক্তি যুবসমাজকে ধ্বংসের মাধ্যমে উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করিয়া থাকে। মাদক শুধু ব্যক্তিজীবনকে ধ্বংস করে না বরং ধ্বংস করে পরিবারকে; অস্থির ও কলুষিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে। মাদকাসক্তির ক্রমবৃদ্ধির কারণে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ রাষ্ট্রের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করিয়া, দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ মাদকের ঝুঁকিতে অবস্থান করিতেছে। বাংলাদেশ মাদক উত্পাদনকারী দেশ না হইলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অবৈধভাবে মাদক পাচারের চ্যানেল হিসাবে ব্যবহার করা হইতেছে। এই মাদকের সমস্যা হইতে দেশকে রক্ষা করিতে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে সরকার। সম্প্রতি কলেজে ভর্তি ও চাকরিতে নিয়োগের পূর্বে ডোপ টেস্টের সুপারিশ করিয়াছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মাদক আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেইভাবে সমস্যা সৃষ্টি করিতেছে, তাহাতে এই উদ্যোগ ইতিবাচক ফল বহিয়া আনিবে বলিয়া আমরা মনে করি। তরুণ সমাজ, বিশেষ করিয়া কলেজগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করিয়াছে। এই বয়সিরা সহজেই একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হইয়া থাকে। মাদকের মতো নেতিবাচক প্রভাব আরো দ্রুত ছড়াইয়া পড়ে। ফলে সামাজিক সচেতনতা ও প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি ডোপ টেস্ট এখনই প্রচলন করা দরকার। ডোপ টেস্ট হইল জৈবিক নমুনা—যেমন মূত্র, রক্ত, শ্বাস, ঘাম এবং মৌখিক তরল বা লালার রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং ইহার সাহায্যে নির্দিষ্ট মাদক বা তাহাদের বিপাকের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি নির্ধারণ করা। ডোপ টেস্টের সাহায্যে সাধারণত খেলাধুলায় কর্মক্ষমতা বাড়ানো স্টেরয়েডগুলির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়; কোনো কোনো রাষ্ট্রে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, এমনকি পুলিশ নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট করানো হয়। আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ মাদক, যেমন—গাঁজা, কোকেন, অ্যালকোহল, মেথামফেটামিন এবং হেরোইন ইত্যাদি গ্রহণ করিলে টেস্টে ধরা পড়ে।
প্রতি বছর বাংলাদেশে অবৈধ ও নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের পিছনে খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। নিষিদ্ধ মাদক সেবনকারী, ব্যবসায়ী ও তাহাদের পৃষ্ঠপোষকগণ শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধই করে না, তাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদির মতো অপরাধের সঙ্গেও জড়িত। দেশে সংঘটিত প্রায় ৭০ শতাংশ অপরাধকর্ম কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে যে কোনো মূল্যে হউক মাদক সমস্যা হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। এই জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডোপ টেস্টের প্রচলন করা গেলে তাহা মাদক সমস্যা নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখিবে।