গত বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু-আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৫ এবং ডেঙ্গু-আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ১৬৪ জন। এযাবত্কালে এটিই ছিল বাংলদেশে সর্বাধিক ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছরই বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগী কম-বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুর এই ভয়ংকর হয়ে ওঠার পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ছোটো হয়ে যাচ্ছে শীতকালের দৈর্ঘ্য। গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে এ ধরনের পরিবর্তনের ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসের বাহক অধিক হারে বংশবিস্তার করছে। এ ধরনের অয়াবহাওয়া মশা, ইঁদুর ও রোগ বিস্তারকারী অন্যান্য প্রাণীর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ২০১৯ সালে হংকংয়ে শীতকাল ছিল সংক্ষিপ্ত। এ সময় হংকংয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তপমাত্রা ছিল মাত্র তিন দিনেরও কম। জলবায়ু পরিবর্তন এভাবেই বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর অভাবনীয় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন রোগের বাহক প্রাণী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে দিচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগের সঙ্গে আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বাতাসের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, সূর্যের আলোর উপস্থিতি ইত্যাদি উপাদানের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার বংশবিস্তার এবং ভাইরাসটির সক্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকগণ দেখতে পেয়েছেন ২২ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ডেঙ্গুর বিস্তার সব থেকে বেশি ঘটতে পারে। তবে তাপমাত্রার এই বিস্তার ১৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্তও হতে পারে। হিসাব করে দেখা গেছে, পৃথিবী জুড়ে প্রায় ১০০ ট্রপিক্যাল ও সাবট্রপিক্যাল দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ এই রোগের কারণে মৃত্যুবরণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশেই বাতাসের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, একই সঙ্গে আর্দ্রতার পরিমাণেরও পরিবর্তন ঘটছে। সামগ্রিকভাবে শীতকালের দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে গ্রীষ্মের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া অসময়ে বৃষ্টিপাত ডেঙ্গুর বিস্তারে সহায়ক হয়ে উঠছে। পরিবর্তিত জলবায়ু অনেক দেশেই ডেঙ্গুর বিস্তারে নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু ছাড়াও হিট স্ট্রোক, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। অন্যান্য ইনফেকশন ঘটায় এমন রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবহাওয়া পরিবর্তনের দায় রয়েছে।
মানবসভ্যতায় জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত যে ক্ষতি সাধন করে চলেছে, তা কল্পনাতীত। কার্বন নিঃসারণ এবং পরিবেশদূষণের জন্য সিংহভাগ দায়ভার উন্নত বিশ্বের হলেও এর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে অনুন্নত দেশগুলোর। বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঘনবসতির দেশে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে না পারলে ডেঙ্গুর মতো যেকোনো রোগই মহামারি ধারণ করতে পারে। বৈশ্বিক পরিসরে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে না পারলেও আমরা অন্তত সবুজায়ন, দূষণ রোধ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় পরিসরে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারি, আর এটাই হবে আমাদের জন্য সব থেকে সময়োপযোগী উদ্যোগ।
n লেখক :প্রকৌশলী