প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই পাপিয়া গ্রেফতার : কাদের

শামীমা নূর পাপিয়াকে কারা এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন এবং যাদের মাধ্যমে তিনি এতো বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েছে- তাদের তালিকা করছেন গোয়েন্দারা। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে। র্যাব জানিয়েছে, জড়িত যে-ই হোক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এদিকে, ইয়াবার বড়ো বড়ো চালানও আসতো পাপিয়ার কাছে। আর এসব বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীদের মনোরঞ্জনে ব্যবহার করা হতো সুন্দরী তরম্নণীদের। সবাইকে ম্যানেজ করেই খোদ রাজধানীতে বসে অবাধে মাদক বিক্রি করতেন তিনি।

শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ছাড়াও মাদক সাম্রাজ্যের অনেক রাঘব-বোয়ালদের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্যতা। তার নংসিংদীর বাসায় আছে টর্চার সেল। সেখানে নির্যাতন-ভয়ভীতি দেখিয়ে মানুষের জায়গা-জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লিখে নিতেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকরি দেওয়ার নামে তরম্নণীদের এনে ওখানে আটক করা হতো। পরবর্তীতে তাদের দেহ ব্যবসা করাতে বাধ্য করতেন পাপিয়া। মাদক ব্যবসার কাজেও এই বাড়িটিও ব্যবহার করা হতো। গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। নির্যাতনের শিকার চার ব্যক্তি কর্মকর্তাদের কাছে বিসত্মারিত জানিয়েছেন। পাপিয়ার অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের অনেকের নাম ইতিমধ্যে গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর সেতু ভবনে বাংলাদেশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের চুক্তি সই অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুব মহিলা লীগের নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার বিষয়ে জানতেন। তিনিই পাপিয়াকে গ্রেফতার করতে এবং তদন্ত্ম করে বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। র্যাব সে নির্দেশ অনুযায়ী পাপিয়াকে গ্রেফতার করেছে। তিনি বলেন, অপকর্ম করে কেউ পার পাবে না। বিএনপি ড়্গমতায় থাকাকালীন কোনো নেতা অপকর্ম করলে তাকে গ্রেফতারের নজির নেই। এদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সত্ সাহস দেখিয়েছেন। দলের মধ্যে যারা অপকর্ম করছে, তাদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

জানা গেছে, পাপিয়ার রয়েছে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনীর নাম ‘কেএমসি গ্রম্নপ’। এর অর্থ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর (রহ.) নামের আদ্যড়্গর দিয়ে নিজের দেহে ট্যাটুও করিয়েছেন তিনি। অপরদিকে যুব মহিলা লীগ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত শামীমা নূর পাপিয়ার জলকেলির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, সুইমিংপুলে পাঁচজন মেয়ের সঙ্গে জলকেলি করছেন পাপিয়া। এ সময় বিভিন্ন গানের সঙ্গে গলা মেলাতে দেখা যায় তাদের। এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাপিয়ার একটি টিকটক ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। পিসত্মল হাতে সেই টিকটক ভিডিও বানিয়েছিলেন পাপিয়া। এতে ‘গোলাবি আঁঁখে’ শিরোনামের গানে পারফর্ম করতে দেখা যায় তাকে। গ্রেফতারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

ধর্ম পালন নিয়েও আলোচনায় আছেন শামীমা নূর পাপিয়া। গোয়েন্দা  কর্মকর্তারা জানান, পাপিয়া শিবলিঙ্গের পূজা করতেন, কালীপূজাও করতেন নিয়মিত। আবার খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক ক্রুসও ব্যবহার করতেন। কাবা শরিফের লোগোও নিজের কাছে রাখতেন।

ধারণা করা হচ্ছে, অবৈধভাবে অর্থ আয়ের জন্য সব ধর্মের লোকদের বিশ্বাস স্থাপন করতে তিনি এমন কৌশল নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেনসিয়াল স্যুইটটি রং মহল হিসেবেই ব্যবহার করতেন পাপিয়া। সেখানে খরচ করতেন কোটি কোটি টাকা। হোটেল বয়দের টিপস দিতেন ১০-১২ হাজার টাকা। সবই করতেন নগদে। এসব টাকার উত্স খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, মাদক-অস্ত্র চোরাচালান, জমি দখল করিয়ে দেওয়া ও হোটেলে নারীদের দিয়ে যৌন বাণিজ্য থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আসত তার হাতে।

এসব অভিযোগে গ্রেফতারের আগে ভারতে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি।  বিমানবন্দরে পাপিয়া, তার স্বামী নরসিংদীর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন এবং তাদের সহযোগী আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। ভারতে যাওয়ার সময়ও পাপিয়া ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেনসিয়াল স্যুইটের বুকিং বাতিল করেননি। এই হোটেল থেকেই তিনি স্বামীসহ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরে যান। গত বছরের ১২ অক্টোবর সে প্রথম হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেনসিয়াল স্যুইটটি ভাড়া নেয়। গত ১৫ ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত্ম তিনি তিন কোটি ৪১ হাজার ২০৪ টাকা পরিশোধ করেন। পাপিয়ার বিরম্নদ্ধে জাল মুদ্রা, অস্ত্র ও মদ উদ্ধারের ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় তাকে ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। বর্তমানে জাল টাকা মামলায় তার ৫ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনেকের নাম বলেছেন বলে জানা গেছে।  এদিকে ‘কার একসেন্স’ নামে এফডিসির পাশে পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এক কোটি টাকার বিনিময়ে পার্টনার হন পাপিয়া। তার ওই পার্টনারের সাথেও অবৈধ সম্পর্কের তথ্য পান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।