ক্রিকেট দলনেতা থেকে জননেতা মাশরাফি

খেলার মাঠে ১০ জন সতীর্থ নিয়ে প্রায় দুই যুগ ধরে লড়াই করছেন। রাজনীতির মাঠে নাম লেখানো মাশরাফি বিন মুর্তজার বাহুলগ্না এখন শত শত তরুণ। তারুণ্যের দীপ্তি নিয়ে এগুচ্ছে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়কের রাজনীতির নব্য মিশন।

ক্রিকেট খেলে গোটা দেশের আপামর জনসাধারণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। এবার জন্মস্থানের জনগণের অফুরন্ত ভালোবাসার বরমাল্য শোভা পাচ্ছে মাশরাফির গলায়। প্রীতি, সম্মান, শ্রদ্ধার মহাসমারোহে গতকাল দিনভর নড়াইলের লোহাগড়ার পথ-প্রান্তর চষে বেড়িয়েছেন তিনি। গতকাল সোমবার সরেজমিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি মাশরাফির নির্বাচনী বহরে থেকে দেখা গেছে, নড়াইলবাসীর কাছে কতটা আরাধ্য তিনি।

লোহাগড়ার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে নড়াইল-২ আসন। যেখানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাশরাফি। গত নির্বাচনেও সেখানে মহাজোটের প্রার্থী ছিল। নিজেদের ছেলে মাশরাফির কাছে অনেক চাওয়া-পাওয়া এলাকাবাসীর। সর্বস্তরের জনগণের কাছে তিনি এই এলাকার উন্নয়নের শেষ আশ্রয়স্থল। ২২ গজে দেশবাসী যেমন তাকে ঘিরে স্বপ্ন বুনে, তেমনি আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লোহাগড়াবাসী সুদিনের আশায় বুক বাঁধছে।

নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রবি শেখ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলছিলেন, ‘উনি (মাশরাফি) এমপি হলে উন্নয়ন নিশ্চিত। এটা আমরা সবাই জানি। অন্যরা তো টাকা মেরে খায়। উনার সততা, নিষ্ঠা, এলাকার প্রতি টান নিয়ে কারো সন্দেহ নাই।’

গতকাল সকাল ১০টায় সবুজ পাঞ্জাবি, কালো চাদর গায়ে বের হন মাশরাফি। গণসংযোগ করেছেন বিভিন্ন এলাকায়। প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত ১৪-১৫টি পথ সভায় বক্তব্য রেখেছেন। প্রায় তিনশ মোটরসাইকেল ছিল তার বহরে। যেখানে খোদ মাশরাফিও ছিলেন একটি মোটরসাইকেলে। ক্রিকেটার সৈয়দ রাসেল, ডলার মাহমুদ, মুরাদ খানরা গোটা দিন ছিলেন বন্ধুর পাশে। 

মোড়ে মোড়ে নারী, পুরুষ, শিশু, তরুণ-তরুণীর ভিড় ছিল। প্রিয় মাশরাফিকে একনজর দেখতে উন্মুখ সবাই। আবালবৃদ্ধ-বনিতা ব্যানার, ফেস্টুন হাতে রাস্তার ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে-মুখে রাজ্যের রোমাঞ্চ। বিশেষ করে নারী, তরুণী, কিশোরীদের মাঝে ছিল ব্যাপক উত্সাহ, উদ্দীপনা। মাশরাফিও দিনভর এই রুদ্ধশ্বাস ছুটে বেড়ানোর মাঝেই বিভিন্ন স্থানে নারী-শিশুদের আলাদা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের আগ্রহে তাদের দিকে এগিয়ে গেছেন।

পথসভার স্থলগুলো ছিল লোকে-লোকারণ্য। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা হর্ষধ্বনিতে বরণ করে নিয়েছেন দলের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীকে। সর্বত্রই নেতাকর্মীরা অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন, ভোট চেয়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মাশরাফির জন্য।

নির্বাচনী প্রচারে নেমে জামাই আদরও পেয়েছেন মাশরাফি। লোহাগড়ার ছত্রহাজারীর মিতালী স্কুল মাঠের পথসভায় এমন আতিথ্য পেয়েছেন তিনি। এই এলাকা তার স্ত্রী সুমনা হক সুমির বাবার বাড়ি। জামাই মাশরাফিকে গানের তালে বরণ করা হয়। নিজের গ্রামবাসীর কাছে স্বামীর জন্য ভোট চান সুমি। সেখানেই জনৈক সঞ্চালক শুরুতে ঘোষণা করেন, এখন কোনো স্লোগান হবে না। এখন সবাই নিজের মতো করে ছবি তুলেন, সেলফি তুলেন। আমাদের জামাই এসেছে।

তবে পথ সভাগুলোতে প্রথাগত রাজনীতিবিদদের মতো প্রতিশ্রুতির জোয়ার বইয়ে দেননি মাশরাফি। চেয়েছেন সবার সহযোগিতা ও নৌকার জন্য ভোট। নিজের বক্তব্যে নড়াইল এক্সপ্রেস বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কথা বলিনি। বলতেও চাই না। খেলোয়াড় সুলভ মানসিকতা নিয়েই আপনাদের এখানে এসেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে একটি সুযোগ দিয়েছেন। আমাকে নৌকা প্রতীক দিয়ে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। আপনাদের সহযোগিতায় একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ নড়াইল গড়ে তুলতে পারবো ইনশাল্লাহ।’

মাশরাফি মানেই রেকর্ড

নড়াইল শহর এখন মাশরাফিকে নিয়ে ব্যস্ত। তার নির্বাচনী প্রচারণায় সরব শহরের প্রায় সব এলাকা। বিএনপি ও তাদের জোট থেকে মাশরাফির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। এনপিপির চেয়ারম্যান ফরহাদের নির্বাচনী কার্যক্রম সেভাবে চোখে পড়লো না। তবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে ভাবনা নেই মাশরাফির কর্মীদের। তাদের চিন্তা একটাই মাশরাফি যেন সর্বোচ্চ ভোট পায়। তাদের আশা নড়াইল শুধু নয় গোটা দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তিনি। গড়বেন রেকর্ড। সেটি নিশ্চিত করতেই দিন-রাত খাটছে সবাই।

মাশরাফির নির্বাচনী প্রচার টিমের সক্রিয় কর্মী ঢাকার প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগের ক্লাব র্যাপিড ফাউন্ডেশনের ক্রিকেটার সুমন গতকাল বলেছেন, ‘মাশরাফি ভাই মানেই রেকর্ড। আমরা চাই উনি ভোটের মাঠেও রেকর্ড গড়বেন। সর্বোচ্চ ভোট পাবেন। দেশের সব আসনের চেয়ে যেন উনি বেশি ভোট পান সেই চেষ্টাই করছি।’