রোকসানা সুইটি
বাংলাদেশকে ভালোবাসি, তার স্নিগ্ধ ও মনোহারিণী রূপকে ভালোবাসি বলেই বাংলা ভাষাকে ভালোবাসা! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে ভাষার জন্য লড়াই বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র ঘটেছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের বাংলাদেশে।
আমরা বাঙালি এই পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। তবে ইদানীং দেখা যায় বাংলায় কথা বলার ব্যাপারে বর্তমান প্রজন্ম অনেকটা উদাসীন। তারা মনে করে বাংলায় কথা বললে স্মার্টনেস থাকে না। তারা ইংরেজি, বাংলা একসঙ্গে করে একটা জগাখিচুড়ি ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করে। সেটা শুনতে এবং বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয়। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে শুদ্ধ বাংলায় তারা কথা না বলে উদ্ভট একটা ভাষায় তারা কথা বলে। এটা আঞ্চলিকও না, আবার শুদ্ধও না! অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের কলকাতাবাসী যেভাবে শুদ্ধ উচ্চারণ করে বাংলায় কথা বলে তা শুনলেই একটা ভালোলাগা কাজ করে। তাদের সঙ্গে কথা বললেই আমরা বুঝতে পারি আমাদের আর তাদের মধ্যে ভাষার উচ্চারণের দিক থেকে দূরত্ব কতখানি!
বর্তমানে কম্পিউটার, স্মার্টফোন থেকে শুরু করে একেবারে সরল বাটন ফোন, সবখানেই আপনি দিব্যি বাংলায় লিখে ফেলতে পারছেন যখন-তখন, খুব সহজে। বাংলায় টাইপ করার ব্যাপারটি যত সহজ দেখছি আমরা আজকের দিনে, দেড় যুগ আগেও বিষয়টা অতটা সহজ ছিল না। আর অর্ধশতাব্দী আগে বাংলায় টাইপ ব্যাপারটিই ঠিকমতো ছিল না। অবাক করা বিষয় হলেও ঘটনাটি এমনই। তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও যখন কোনো বার্তা আদান-প্রদান করেন তখন তারা ইংরেজিতেই টাইপ করে বাংলায় বুঝিয়ে থাকে। যা কিনা অনেক সময় বুঝার উপায় থাকে না বা অনেক সময় দেখা যায় তার ভিন্ন অর্থ প্রকাশ পায় তাদের লেখায়।
আরেকটা বিষয় দেখা যায় যে, তারা কিছু সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে থাকেন যার অর্থ বুঝা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বাঙালি হিসেবে বাংলায় লেখাটা অনেক বেশি গৌরবের বিষয় বলে মনে করি। আমরা যখন আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি সেই বিষয়টা নিয়ে অনেকে হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠে যা কিনা আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে। একজন বাঙালি হিসেবে এই বিষয়টাকে আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করার মধ্যেও একটা অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালো লাগা কাজ করে। মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাষা আর সেটা নিজের মাতৃভাষা হলে তো তা আমাদের অনেক বেশি গর্বিত করে। আর আমরা বাঙালিরা তো বিশ্বের সকল দেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশিই উপরে অবস্থান করছি যার কারণ হলো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া যা কিনা বিশ্বের আর কোনো রাষ্ট্রে ঘটেনি। তাই আমাদের উচিত বাংলা ভাষাকে সম্মান করা এবং যাদের জন্য এই বাংলা ভাষাটা আমাদের হলো তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি একটা দিনের জন্য তা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে।
শহিদদের জন্য শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যেই যেন তা শেষ না হয়। ভাষার প্রতিও শ্রদ্ধা দেখানো উচিত, বাংলা ভাষাকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যত্নসহকারে তুলে ধরতে হবে, আর চর্চার মাধ্যমেই তা সম্ভব।
n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ