অণুভাবনা

বেড়াল সম্পর্কে বাঙালির রটানো কুত্সাসমূহ

লুত্ফর রহমান রিটন

 

ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি—বেড়াল হচ্ছে চোর। চুরি করা ওদের স্বভাব। আমাদের বলা হয়েছে—মাছের কাঁটা খায় বেড়াল। বংশানুক্রমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমাদের জানানো হয়েছে—বেড়ালের হাড্ডি খুব শক্ত। হাজারো মারপিটে ওদের কিছুই হয় না। যুগের পর যুগ আমাদের বাবা-মা-খালা-চাচি-মামা-চাচা-দাদা-দাদিরা আমাদের উদ্দেশ্যে বলে এসেছেন কথাগুলো।

আমরা খেতে বসলে বেড়াল এসে পায়ের কাছে ঘুরঘুর করত। আমাদের ফেলে দেয়া মাছের কাঁটাগুলো খুব আয়েশ করে খেত বেড়াল। অসাবধানতায় আমাদের গলায় কাঁটা বিঁধলে অভিভাবক শ্রেণির কোনো প্রতিনিধি বলতেন—বেড়ালের পা ধরে মাফ চা।

বেড়ালের খাবার অর্থাত্ মাছের কাঁটাটা তুই খেয়ে ফেলেছিস। অথচ কথাটা কত বড়ো একটা মিথ্যে! মুরুব্বি শ্রেণির মানুষগুলো কোনোদিন বলেননি বেড়ালের প্রিয় খাদ্য মাছ। বলেছেন, মাছের কাঁটা হচ্ছে ওদের প্রিয় খাদ্য। এত বড়ো মিথ্যেটা বংশানুক্রমিক তাঁরা বলে এসেছেন। আর তাই ছোটোরা চিরকাল সেটা জেনেই বড়ো হয়েছে এবং বড়ো হয়ে বেড়ালকে খেতে দিয়েছে সেই মাছের কাঁটাই। মাছ কখনো দেয়নি। কী ভয়ংকর একটা ষড়যন্ত্র বেড়ালদের বিরুদ্ধে মানব সম্প্রদায়ের! নিজেরা মাছটা খাবে বলে মাছের কাঁটাগুলো—যা তারা খেতে পারবে না, এমনিতেই ফেলে দেবে, সেই ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্টটুকু দান করার ভঙ্গিতে বেড়ালকে দিত মহত্ সাজার অভিপ্রায়ে! কী ভয়াবহ হিপোক্রেসি!

ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি—বেড়াল হচ্ছে চোর। সে চুরি করে। মিটসেফের ওপর থেকে। হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে পাতিল থেকে। সুতরাং লাঠিসোটা দিয়ে পেটাও চোরটাকে। কাউকে চোর সাব্যস্ত করে পেটাতে বাঙালি খুব পটু। সে রাস্তার চোরই হোক কিংবা ঘরের বেড়ালই হোক।

বাঁচতে তো হবে! সৃষ্টিকর্তা-প্রকৃতি ওদের এতোটাই অক্ষম করে রেখেছে যে নিজেদের খাবার নিজেরা তৈরি করতে পারে না। জন্মই ওদের আজন্ম পাপ যেন বা। ঝড় বৃষ্টিতে-রৌদ্র খরায় কত কষ্টে ওরা বেঁচে থাকে। ওদের কোনো খোঁজ আমরা রাখি না। মানুষের মতো ওদেরও অসুখ-বিসুখ হয়। ওদেরও অষুধ লাগে চিকিত্সা লাগে। মানুষের মতো ওদেরও হয় ডিহাইড্রেশন। ডিপ্রেশনে ভোগে ওরাও। কিডনি সমস্যায় ভোগে ওরাও। পেটের ব্যথা দাঁতের ব্যথা হয় ওদেরও। হার্ট ডিজিজেও আক্রান্ত হয় ওরা। আর্থারাইটিস হয়। শরীরে টিউমার হয়। ঠান্ডা-সর্দি হয়। পেটের ব্যামো হয়। শ্বাসকষ্ট হয়। মশা বা পোকার কামড়ে ওদের শরীরেও প্রবেশ করে জীবাণু। ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কৃমি ওদের হাত-পায়ের তালু দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে, মানুষদের মতোই। ওদেরও ভ্যাকসিন নিতে হয়। পশু হাসপাতালে ক্লিনিকে চিকিত্সকরা এইসব অসুখ-বিসুখের চিকিত্সা দেন বেড়াল-কুকুরদের পরম যত্নে। আমরা বাঙালিরা সেইসব মহান মানবিক চিকিত্সকদের ‘পশুর ডাক্তার’ বলে অবজ্ঞা করার হাসাহাসি করে ধৃষ্টতা দেখাই।

এতোটাই নিকৃষ্ট আমরা! এত বড়ো আপনার বাড়ি। সেই বাড়িতে ছোট্ট একটা অসহায় বেড়ালের আশ্রয় কি হতে পারে না? ওদের একটু ভালোবাসা দিয়ে দেখুন আপনাকে ওরা একলক্ষ গুণ ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবে।