মাহবুব শরীফ
তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে দেশে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার যত বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ অন্য মাধ্যমগুলোয় এ অপরাধের প্রবণতা বেশি।
সাইবার অপরাধ এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন দেশের সাইবার অপরাধ নিয়ে একটি গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সেখান থেকে জানা যায়, শতকরা প্রায় ৫২ ভাগ অভিযোগই আসে নারীদের থেকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি মেয়েরা। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৭৪ শতাংশ। অভিযোগের একটি বড়ো অংশের অভিযোগ ফেসবুক সংক্রান্ত। যার মধ্যে আইডি হ্যাক থেকে শুরু করে সুপার ইম্পোজ ছবি এবং পর্নোগ্রাফির মতো ভয়াবহ অভিযোগও রয়েছে।
হয়রানির শিকার হলেও ভুক্তভোগীদের ৩০ শতাংশই এর বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় সে বিষয়ে জানেন না। বাকিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না ভেবে অভিযোগ করেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এক্ষেত্রে প্রতিকারের উপায় নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার অভাব এবং লোকলজ্জা ও ভয়ভীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন নারীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তেমনি ব্ল্যাক-মেইল ও হুমকির কারণে তাদের ব্যক্তিগত জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের অজ্ঞতার কারণে দিনকে দিন এ ধরনের অপরাধ বেড়েই চলছে বলে মত সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক কাজী মুস্তাফিজ।
তিনি জানান, ‘সহজে হাতের কাছে ইন্টারনেট পাওয়ার কারণে ইন্টারনেটের অপব্যবহার বাড়ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার হামলায় শিকার হন। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র ওষুধ হলো সচেতনতা বাড়ানো। প্রযুক্তির সুবিধাগুলো ভোগ করার পাশাপাশি এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।’
প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক মনিটরিংয়ের পাশাপাশি বাবা-মা ও অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মেখলা সরকার। এক্ষেত্রে তিনি মিডিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। সাইবার অপরাধের ব্যাপারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের সামাজিক দক্ষতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
প্রতিকার
বাংলাদেশে ২০০৬ সালে প্রথম সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণয়ন করা হয়। এরপর ২০১৩ সালে এই আইন সংশোধন করা হয়। সে বছর ঢাকায় স্থাপন করা হয় দেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালটি। এ আইনে কারো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তোলা এবং তা প্রকাশ করার অপরাধে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের সঠিক ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন করার পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ করা হলে সাইবার অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া, সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে একটি সাইবার হেল্প ডেস্কও রয়েছে। এই হেল্পলাইন সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কেউ হেল্পলাইনে সরাসরি ফোন করে অথবা এসএমএসের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
এছাড়া সাইবার হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে হটলাইন ‘৯৯৯’ চালু করেছে সরকার। যে কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হলে এই হটলাইনে ফোন করেও অভিযোগ জানাতে পারবেন। বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র?্যাব) সাইবার অপরাধ তদন্ত বিষয়ক সেল রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর তত্পরতা এগিয়ে নেওয়া এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ।
অনলাইন ব্যবহারকারীদেরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আইটি বিশেষজ্ঞরা। নিজের ফেসবুক, ইমেইল আইডি সুরক্ষিত রাখতে নিয়মিত পাসওয়ার্ড বদলানো এবং এ ধরনের গোপনীয় তথ্য কারো সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দেন তারা।
গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়াদের ৪৪ শতাংশই মনে করেন অপরাধীদের তাত্ক্ষণিক শাস্তি দেওয়া গেলে ঘুণপোকা খ্যাত এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে। বাকিদের মধ্যে ২৯ শতাংশ আইনের প্রয়োগ বাড়ানো এবং ২৭ শতাংশ সচেতনতা গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।
কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে
২০১৩ সালে আইসিটি আইন সংশোধন করা হলেও, আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক থেকে গেছে। কারণ ৫৭ ধারাটি এমন সব ইস্যু যুক্ত করা হয়েছে, যার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা আইনে নেই। ফলে আইনটি ইচ্ছেমতো ব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, থানায় মামলা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের সাইবার অপরাধ বিষয়ে তেমন একটা দক্ষতা নেই। এ কারণে প্রযুক্তিতে দক্ষ অপরাধীদের মোকাবিলায় পুলিশ কতটা প্রস্তুত, সেটি একটি বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের ৩৯ শতাংশ থানা পুলিশের কাছে গিয়েও আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। দক্ষতার অভাবে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাইবার অপরাধের বিষয়গুলো তদন্তে হিমশিম খেতে হয়।
এছাড়া অভিযোগের তদন্ত করার সময়ের মধ্যেই বিতর্কিত পোস্টটি হয়তো ভাইরাল হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে রিপোর্ট করেও কোনো কাজ হয় না। এছাড়া গুগলে স্থায়ীভাবে সেগুলো থেকে যাওয়ায় সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন ভুক্তভোগীরা।
সূত্র :বিবিসি