বাংলাদেশে প্রতিদিনই সড়কে ঝরে তাজা রক্ত। প্রাণ হারায় গড়ে ১২ জন মানুষ। কী কারণে সড়কে রক্তের দাগ শুকাইবার পূর্বেই নূতন করিয়া রক্তের ছোপ পড়ে—তাহার কারণ কাহারো অজানা নহে। সড়ক দুর্ঘটনা লইয়া শোকগাথা, সতর্কবার্তার শেষ নাই, চলিতেছে বিস্তর লেখালেখিও। কিন্তু কোনো কিছুই আটকাইতে পারে না এই ধরনের পরবর্তী দুর্ঘটনার লাগাম। সম্প্র্রতি বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোড সেফটি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিশ্বে সবচাইতে ভয়ংকর বাংলাদেশের বাস। দেশে প্রতি ১০ হাজার বাসের বিপরীতে বাস সম্পৃক্ত দুর্ঘটনায় প্রতি বত্সর প্রাণহানি ঘটে ২৮৭ জনের। বাংলাদেশের মতো বিশ্বের আর কোথাও বাস সম্পৃক্ত দুর্ঘটনায় এত বেশি প্রাণহানির নজির নেই। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় প্রতি ১০ হাজার বাসের বিপরীতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটে যথাক্রমে ৮৭ ও আট জন ব্যক্তির।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে বাসের দায় ২৬ শতাংশ। বাংলাদেশের পর বিশ্বে সবচাইতে বেশি প্রাণঘাতী বাস দুর্ঘটনাপ্রবণ অন্য দেশগুলির মধ্যে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ায় এই হার ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১ শতাংশের মতো। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অসংখ্য কারণ রহিয়াছে। দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, চালকদের ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা, পথচারীদের অসচেতনতাসহ এই তালিকা দীর্ঘতর করা যায়। কিন্তু দুর্ঘটনা এবং তাহার সহিত অধিক প্রাণহানির জন্য প্রধানত দায়ী আমাদের নিম্নমানের বাস। এই কারণে আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির মধ্যে বাসের সম্পৃক্ততা এত বেশি। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দেখিয়াছেন, দেশে চলাচলরত বাসগুলির সিংহভাগেরই বডি স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়। বিদেশ হইতে আনা হয় শুধু চেসিস। স্থানীয়ভাবে বডি বানানোর সময় ইহাতে সিট বসানো হয় মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী। বেশি সিট বসানো হইলে বাসের ভারসাম্য ঠিক থাকে না। আবার সিটগুলির ওয়েল্ডিংও হয় নিম্নমানের। ফলে বাস যখন দুর্ঘটনায় পড়ে, তখন প্রাণহানি হয় স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি।
দুর্ঘটনা, যাহাকে আভিধানিকভাবে বলা হয় ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’—অর্থাত্, যাহা কাঙ্ক্ষিত ও অভিপ্রেত নহে। কিন্তু দুর্ভাগ্য কখন বলা হয়—যখন তাহা দৈবদুর্বিপাকে হইয়া থাকে। বিশ্বের আর কোথাও কি বাংলাদেশের মতো এমন জ্ঞাতসারে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে বত্সরের পর বত্সর? যদি ঘটিয়াই থাকে, তবে তাহাকে কি ‘দুর্ঘটনা’ বলা যায়? প্রায় এক দশক পূর্বেই সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানিয়া ধরিবার অঙ্গীকার ছিল আমাদের। ২০১১ হইতে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামাইয়া আনিতে জাতিসংঘে অঙ্গীকার করিয়াছিল বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বাংলাদেশ স্বাক্ষরও করিয়াছে। কিন্তু বাস্তবতা হইল এই এক দশকে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তাত্পর্যপূর্ণ কোনো অগ্রগতি সাধিত হয় নাই। তাই রাস্তার লেন যতই বৃদ্ধি করিবার পরিকল্পনা হউক না কেন, সড়ক-মহাসড়কে ১৪৪টি দুর্ঘটনাপ্রবণ মোড়গুলোকে চিহ্নিত করিয়া তাহা ক্রমান্বয়ে মেরামত করা হউক না কেন—বাস ও চালক ঠিক না হইলে আমাদের সড়কে মৃত্যুমিছিল কমিবে না সহজে।