সাইফুল ইসলাম হাফিজ
সদ্যসমাপ্ত হওয়া অমর একুশে বইমেলার একটি ঘটনা। মেলার শুরুর দিকে দেশের একজন প্রবীণ লেখক মেলায় এসে নিজের বই এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ফেরি করে বেড়াচ্ছিলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি ঐ লেখকের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়লে খুব অল্প সময়েই সারাদেশে তা ভাইরাল হয়ে যায়। সবাই চিনতে পারে ঐ লেখক সম্পর্কে। ড. ফয়জুর রহমান আল সিদ্দিক। একজন পরমাণুবিজ্ঞানী। বাংলাদেশের গর্ব; বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক পরিচালক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরমাণুবিজ্ঞানী প্রয়াত ড. ওয়াজেদ মিয়ার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। ভাইরাল হওয়ার পর বেশ কয়েকটি প্রকাশনী তার বই প্রকাশ করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে ‘বাঙালির জয়, বাঙালির ব্যর্থতা’ নামে বই প্রকাশও করেছেন। অথচ অল্প কয়েকদিন আগেই তার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত, ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ব্যক্তি ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ চিনত তাকে। তাকেও নিজের রচিত গ্রন্থ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফেরি করতে হয়েছে স্টল থেকে স্টলে। স্যারের মতো অশীতিপর বৃদ্ধ একজন মানুষের প্রতিভা প্রকাশ করতে যদি এত কাঠখড় পোড়াতে হয়, বুঝতেই পারছেন, কোনো নতুন লেখকের প্রতিভা বিকাশের দরুন বই প্রকাশ করতে কতখানি ঘাম ঝরাতে হয়। বর্তমানে সারা বিশ্ব জুড়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রভাব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্যের জাল বিস্তৃত। বড়ো-ছোটো সব ধরনের খবর চক্ষুগোচর হয়। দালানের ওয়ালে সেট করা থাকে ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি)। এই আধুনিকতা আর প্রযুক্তির প্রতাপে কিছুই লুকানোর অবকাশ নেই। কিন্তু এর মাঝেও অনেক খবর লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। অনেক প্রতিভা আলোর মুখ দেখে না। অনেক প্রতিভাবান লোকের কদর হয় না। প্রায়ই শোনা যায় যে, অমুক এলাকায় কোনো সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধা খুব অভাবের সংসার করছেন কিংবা দারিদ্র্যের কশাঘাত সয়ে খুব টানাপোড়েনে দিন কাটাচ্ছেন। দেশকে বাঁচাতে জীবনের মায়া ত্যাগ করে, যুদ্ধ করে দেশমাতৃকার হাতে অর্পণ করেছেন স্বাধীনতা। কিন্তু আজও তাদের জীবন অনাড়ম্বর। অথচ রাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে সুযোগ লুফে নেওয়ার জন্য অনেক ভুয়া লোক মুক্তিযোদ্ধা সেজেছে। আবার দেশের মফস্সলে, শহরে অনেক তীক্ষ মেধাবী এবং প্রজ্ঞাদীপ্ত কবি-সাহিত্যিক আছেন। যাদের লেখার শৈলীতে চিত্রায়িত হয়েছে পল্লিগাঁয়ের মনোমুগ্ধকর রূপ। কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে তাদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল বইয়ের পাতায় প্রকাশিত হয় না। বাঙালির অন্যতম বিনোদনের জগত্ হলো ক্রীড়াজগত্। এই ক্রীড়াজগেক আরো সমৃদ্ধ করতে পারে এমন অনেক খেলোয়াড় রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। যারা ঘরোয়া খেলাধুলায় বেশ ভালো পারফরম্যান্স করে। কিন্তু যথাযথ সহায়তা না পেয়ে দিনের পর দিন জাতীয় দলের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের এই প্রতিভা বর্তমান খেলোয়াড়দের প্রতিভার সঙ্গে যোগ হলে বাংলাদেশ ক্রীড়া বিশ্বে পরাশক্তি রূপে আবির্ভূত হতে পারে। এই আধুনিক বিশ্বে সাংবাদিকদের শত ত্যাগের কারণে প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় হাজার হাজার খবর ছাপা হলেও কিছু খবর পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় স্থান পাচ্ছে না। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তার বিখ্যাত একটি গানের মধ্যে লিখেছেন, ‘প্রতিদিন কত খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে, জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে’। যেখানে আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় ড. ফয়জুর রহমান স্যারের ছবি তুলে না দিতেন তিনিও হয়তো থেকে যেতেন পর্দার অন্তরালে। তাই এই ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে এবং রাষ্ট্রের সচেতন হয়ে পদক্ষেপ নেওয়ারও প্রয়োজন আছে। এ রকম বুদ্ধিদীপ্ত মেধা আর তীক্ষ প্রতিভার অন্বেষণে দেশের প্রত্যেক স্থানে সরকারের নজর দিতে হবে। প্রতিভারা যেন অবহেলার চাদরে ঢেকে না যায়। যথাযথ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তারাও যেন ঊষার কোলে রাঙা রবির মতো জ্বলে উঠতে পারে। সবাই যেন তার জ্ঞানের মূল্যায়ন পায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ঐকতান’ কবিতায় বলেছেন, ‘সাহিত্যের ঐকতান সংগীত সভায় একতারা যাহাদের তারাও সম্মান যেন পায়’। লেখকদেরকে লেখার, খেলোয়াড়দেরকে খেলার নৈপুণ্য, বিজ্ঞানীদেরকে উদ্ভাবনী শক্তির প্রকাশ, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফয়জুর রহমান স্যারের মতো আর কোনো প্রবীণ গুণীজনকে যেন নিজের বই ফেরি করে বেড়াতে না হয়। সকলে জাতীয় মঞ্চে এসে যেন প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের গভীর দৃষ্টিপাত করা জরুরি। তাদের প্রতিভার ফসলে বাংলা মায়ের কোল আরো সমৃদ্ধ হবে। বিশ্ব দরবারে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলতে পারব,‘আমরা বাঙালি, আমরাও পারি’।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়