‘নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ স্লোগানে গতকাল ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের মতোই গর্জে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা। কেন্দ্রীয় ১৪ দলের উদ্যোগে আয়োজিত নারী-শিশু নির্যাতনবিরোধী বিশাল সমাবেশে জাতীয় নেতৃবৃন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের ঠাঁই হবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দানবীয় এই অপশক্তিকে পরাস্ত করা হবে। নারী-শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে আইন সংশোধন করে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। স্বাধীনতার মাসের প্রথম দিন বিকাল ৩টায় সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লক্ষাধিক মানুষ এই সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশু মৃত্যু রোধে আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হন, সেই বাংলাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন চলতে পারে না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। তারা সব অর্জন নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে। নারী-শিশু নির্যাতন একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু এটা সামাজিক অবক্ষয়, তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে এই অপশক্তিকে নির্মূল করতে হবে।
আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক ও খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেন, ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, ভারতের কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান মিত্র। মুজিববর্ষে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তারা অবশ্যই মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে আসবেন। কোনো শক্তি তাদের আসা রুখতে পারবে না। দিল্লির দুঃখজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাউকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে দেওয়া হবে না। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত সৃষ্ট জঙ্গি দমন করতে সক্ষম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের সৃষ্ট অন্ধকারের বাংলাদেশ এখন আলোকিত। এদেশে নারী-শিশু নির্যাতনকারী দানবীয় পশু শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে পরাস্ত করতে হবে। মুজিববর্ষের কর্মসূচি ঘোষণা করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আগামী ১৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করা হবে। মোমবাতি হাতে শোভাযাত্রা সহকারে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। এই কর্মসূচি একযোগে সারাদেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। সর্বস্তরের মানুষের এই কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপির উদ্দেশে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ভুল স্বীকার করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করুন। তাহলে হয়তো জাতি আপনাদের ক্ষমা করতে পারে। বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কোনো আপস হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, যারা নারী-শিশুর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করে, তাদের রুখতে হবে। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ দমন করেছেন, সেই দেশে কোনো নারী-শিশু নির্যাতনকারীর, ধর্ষকের স্থান হবে না। এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ নিতে হবে। নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করতে প্রয়োজনে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, নারী নির্যাতনকারীদের আপনারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড শাস্তির ব্যবস্থা করুন।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, নারী-শিশু নির্যাতনকারীরা দেশ ও জাতির শত্রু। তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি বলেন, নারীর উন্নয়নের ব্যাপক অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেন, নারীরা আর গণিমতের মাল হবে না, নারীরা আর নুসরাত হবে না। এজন্য প্রয়োজন শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করা।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, রাজাকার, পাকিস্তানের দোসর ও জঙ্গিরা ধর্ম প্রচারের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে। নারী-শিশু নির্যাতনের কারণ রাজনৈতিক ও সামাজিক। যারা ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তারা ধর্মীয় ওয়াজের নামে নারীবিদ্বেষী বক্তৃতা দিচ্ছে। তাদের দমন করতে হবে। জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিতে হবে, ওয়াজে নারীবিদ্বেষী কোনো কথা, নারীনীতি বিরোধী কোনো কথা চলবে না। যারা নারীবিদ্বেষী ওয়াজ করবে তাদের দাঁড়াতে দেবেন না। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
জাতীয় পার্টির-জেপি সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও মুজিব আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হবে। যতদিন না এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে, ততদিন দুর্নীতি ও সামাজিক অপরাধ নির্মূল হবে না। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এমপি, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, কামরুল ইসলাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের নেতা রফিকুল আলম, সাবেক সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরী, নারী নেত্রী হাজেরা সুলতানা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী, বিএমএ সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, মেহের আফরোজ চুমকি এমপি, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য নিম চন্দ্র ভৌমিক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য, জেলা আওয়ামী লীগের নেতা তোফাজ্জল হোসেন দয়াল প্রমুখ। সমাবেশের আগে মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে নেতৃবৃন্দ শিখা চিরন্তনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।