রীতিমতো বীভত্স একটি ছবি ছাপা হইয়াছে সহযোগী একটি দৈনিক পত্রিকায়। না, উহা কোনো মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহের ছবি নহে। অথবা কোনো ঝড়-ঝঞ্ঝায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও নহে। উহা টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার দাপনাজোর গ্রামের মধ্য দিয়া প্রবাহিত জিনাই নদের উপর নির্মিত একটি পাকা সেতুর ছবি। ব্রিজের নিচে পানি প্রায় নাই, সেই নদের গর্ভ হইতে তুলিয়া লওয়া হয় বালু। ফলে দাবিয়া গিয়াছে ঐ সেতু। ঐ সেতুর পায়ার এমনকি পাইল ক্যাপও ছবিতে পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে। প্রকৌশলী হইবার দরকার নাই, খালি চোখে সাধারণ্যের অনুমান করিতে কষ্ট হয় না যে, সেতুটি নির্মাণকালেই পায়ার এবং পায়ার ক্যাপ নির্মাণে যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয় নাই।
প্রথম কথা হইল, একটি সেতু বা অন্য কোনো একটি কাঠামো নির্মাণ করিয়া দায়িত্ব সারিলেই হয় না, উহা রক্ষণাবেক্ষণ অতি জরুরি। আর এই রক্ষণাবেক্ষণের দায় কাহারো একার নহে। পত্রিকার রিপোর্টে বলা হইয়াছে, যথেচ্ছ বালু উত্তোলনই সেতুটির বেহাল হইবার প্রধান কারণ। যদি তাহাই হয় তাহা হইলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কী করিয়াছেন? ঐ গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রহিয়াছেন, তাহার উপরে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রহিয়াছেন, তাহারও উপরে সংসদীয় জনপ্রতিনিধি রহিয়াছেন। সর্বোপরি ঐ সেতু ব্যবহারকারী এলাকাবাসী রহিয়াছে। তাহাদের কাহারো মনে হয় নাই সেতুটি রক্ষা করিবার কথা? সেতুটি নির্মাণ করিয়াছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। এই বিভাগেরও রহিয়াছে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা। তাহাদেরও এই সরকারি অর্থ ব্যয়ে তৈরি সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো দায় নাই? জানা গিয়াছে, সেতুটির তিন বত্সর ধরিয়া এই দুর্দশা তৈরি হইয়াছে। যাহারা এই সেতু নির্মাণ করিয়াছেন তাহাদের শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বলিয়াই বিবেচনা করা হয়। প্রকৌশলীরাও পেশাগতভাবে জানেন কোন সেতুটির আয়ুষ্কাল কীভাবে কতদিন থাকিবে, কীভাবে এর আয়ুষ্কাল দ্রুত ক্ষয় হইয়া থাকে। সুতরাং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরে আনিবার একটি দায় তাহাদের উপরও বর্তায়; কিন্তু কেহই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না।
কেবল এই সেতুটি নহে, সারা বাংলাদেশে অসংখ্য সেতু, কালভার্ট, সড়কের জীর্ণ দশা তৈরি হইয়াছে অযত্ন ও অবহেলার কারণে। সেই পুরোনো কথাই বলিতে হয়, সকলের মধ্যেই ‘সরকারকা মাল, দরিয়ামে ঢাল’ মানসিকতা লক্ষ করা যাইতেছে। আমরা জানি, দেশব্যাপী বৈধ এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হইতেছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের সংখ্যা বহুগুণ। দেশের কোনো কোনো স্থানে এমনকি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করিয়া, এমনকি নদীর মধ্যে বাঁধ দিয়াও চলিতেছে বালু উত্তোলন। এই বালু উত্তোলনের সহিত জড়িত থাকে সাধারণত স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তাহারা কি স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য জনপ্রতিনিধির চাইতে অধিক শক্তিশালী? নাকি তাহাদেরই প্রচ্ছন্ন সমর্থনে এই ঔদ্ধত্য চলিতেছে? তবে বরাবরই আমরা স্থানীয় জনগণের সচেতনতার উপর জোর দিয়া থাকি। একটি এলাকার জনগণ সচেতন হইলে সেই এলাকায় এহেন অসংগতি-অবহেলা তৈরি হয় না বলিয়াই আমরা মনে করি।