পরিবেশগত বিপর্যয়কে জাতীয় জরুরি ইস্যু হিসেবে দেখুন

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

সাম্প্রতিককালে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো এশিয়াতেও পরিবেশগত ইস্যুগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণ অধিকতর প্রাধান্য লাভ করেছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রগুলোতে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলের নগর এলাকাগুলোতে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়া ঢাকার তুলনায় কম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহর এলাকায় অনেক সময় এমন সব শিলা ও মৃত্তিকার ওপর বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়, যেগুলোর ভিত্তি থেকে তেজস্ক্রিয় গ্যাস বিকীর্ণ হয়। দীর্ঘ সময় এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় বায়ুদূষণ এখনও তেমন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। কেননা এসব এলাকায় যন্ত্রচালিত গাড়ির সংখ্যা যেমন কম, তেমনি শিল্পকারখানার সংখ্যাও অল্প। তবে ইটের ভাটা এবং রান্নার চুল্লি থেকে শহরতলী ও গ্রামীণ এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণে বায়ুদূষণ ঘটছে। গ্রামাঞ্চলে কাঠ, কয়লা এবং বিভিন্ন ধরনের জৈববস্তু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে আমরা লক্ষ করছি ষড়ঋতুর বাংলাদেশের ঋতু পরিক্রমার ধারাবাহিকতা আর নেই। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুচক্রের এমন কথা এখন শুধু পাঠ্যবইয়েই খাটে। আমাদের পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপের ফলে এখন আর ঋতুভিত্তিক বাংলাদেশকে ছয় ঋতুর কোনো ঋতুকেই আলাদা করে চেনা যায় না। এখন এক ঋতুতে আরেক ঋতুর বৈশিষ্ট্য দেখা দিচ্ছে। দেশে গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। কমে গেছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। শীতে নেই শীতের প্রকোপ। বর্ষায় নেই বৃষ্টি। অথবা কখনো অনাবৃষ্টির কারণে খরা কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হচ্ছে। আবার অসময়ে বন্যা বা আগাম বন্যা, বৃষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফল। আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের মানুষ প্রকৃতিবিমুখ হওয়ার কারণে বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। পাহাড়ধসে পড়ছে। খরা হচ্ছে, বন্যা হচ্ছে—প্রকৃতির এসব বিরূপ আচরণের জন্য একমাত্র মানুষই দায়ী। আমাদের নদীগুলো মরে গেছে। পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। নদী ও খাল খনন হচ্ছে না। বনের গাছ কেটে আমরা সাবার করে ফেলছি। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও সার প্রয়োগ করে আমরা জমির প্রাকৃতিক উর্বরা শক্তি নষ্ট করছি। কলকারখানা, যানবাহন ও ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, ট্যানারির বর্জ্য, নগরীর সাধারণ ও শিল্পবর্জ্যের অব্যবস্থাপনাসহ পানি ও নদীদূষণ সব মিলিয়ে বিষিয়ে তুলেছে পরিবেশকে।

দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে! বিশ্বব্যাংকের জলবায়ুবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আমাদের দেশে চার ধরনের পরিবেশ দূষণ জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে: বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ ও শব্দদূষণ। এসবের অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন তথা তেল, গ্যাস ও কয়লা ইত্যাদির যথেচ্ছ ব্যবহার। কলকারখানা ও ইটভাটা থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন, যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা হাসপাতালের বর্জ্য ফেলা এবং মলমূত্র ত্যাগও পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ।

ঢাকা মহানগরীর শব্দদূষণ মারাত্মক। শব্দদূষণের প্রকোপ ঢাকাসহ বাংলাদেশের জন্য এক সুদূরপ্রসারি পরিণতিবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির হর্ন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ট্রাফিক আইন মান্য করার ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকায় শহরের অনেকাংশে শব্দদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঢাকা শহরের শব্দদূষণ যে মাত্রায় রয়েছে তাতে নগরবাসীর শ্রবণশক্তি দ্রুত কমতে থাকবে। যেসব মানুষ শব্দদূষণের ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত তাদের বধির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এসব তথ্য থাকার পরও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে প্রশাসনের তেমন কোনো তত্পরতা লক্ষ করা যায় না। বিশেষ করে দেশের শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বায়ুদূষণের কারণে সর্বাধিক ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। বায়ুতে অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। প্রতি বছর ঢাকা মহানগরে বায়ুতে প্রায় ৫০ টন সিসা নির্গত হচ্ছে। শুষ্ক ঋতুতে অর্থাত্ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে বায়ুদে সিসার পরিমাণ সর্বোচ্চে পৌঁছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে (Child Development Centre) সম্প্রতি শিশুদের দেহে সিসা দূষণের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষাকৃত শিশুদের রক্তে প্রায় ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডিএল থেকে ১৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডিএল সিসা পাওয়া গিয়েছে যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের নির্দেশনা অনুযায়ী রক্তে ১০ মাইক্রোগ্রাম/ডিএল পরিমাণ পর্যন্ত সিসার উপস্থিতি নিরাপদ। মধ্যম আয়ের নগর এলাকা অথবা গ্রামীণ এলাকার তুলনায় নগরীর বস্তি এলাকায় বসবাসকারী অধিবাসীদের রক্তে গড় সিসার মাত্রায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সিসা দূষণ মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করা ছাড়াও বৃক্ষের সচলতাকে নষ্ট করে দেয় এবং উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে। শিশুদের রক্তে অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি তাদের মস্তিষ্ক এবং বৃক্ষকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। পূর্ণ বয়স্ক মানুষের তুলনায় শিশুরা সিসা দূষণে তিন গুণ বেশি আক্রান্ত হয়।

দেশপ্রেমিক না হলে যেমন দেশকে বাঁচানো যায় না, তেমনি পরিবেশপ্রেমী না হলে পরিবেশ রক্ষা করা যায় না। আর পরিবেশ রক্ষা না হলে আমি, আপনিসহ একে একে দেশ-জাতি সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ধারণাটি ছোটো-বড়ো সবার মনে গেঁথে দিতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় আইনের যথাযথ কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। বনায়ন বাড়াতে হবে। পরিকল্পিতভাবে বনজ, ফলদ ও ভেষজ গাছ লাগাতে হবে। কলকারখানা ও গৃহস্থালির বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলা বন্ধ করতে হবে। সব অঞ্চলেই রি-সাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। চাষাবাদে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। শব্দদূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে ফরমালিনমুক্ত হাটবাজার বানাতে হবে। আমরা প্রত্যেকেই যদি পরিবেশের নিজ নিজ অংশটুকু রক্ষা করি, তাহলেই পুরো পরিবেশও রক্ষা হবে। তাই ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় থেকে দেশ-জাতি তথা নিজেকে বাঁচাতে আসুন, এখনই সর্বপ্রথম নিজের ঘর থেকেই পরিবেশ রক্ষার কাজটি শুরু করি।

n লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক