সফররত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা সোমবার ঢাকায় বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এগুলো একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সিএএ কোনো ধর্মেরই বিরুদ্ধে নয়।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস্) ও ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। ‘বাংলাদেশ-ভারত:একটি প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যত্’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী প্রধান অতিথি ছিলেন। বিস্ চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত এম ফজলুল করিমের সভাপতিত্বে সেমিনারে ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ বক্তব্য রাখেন। বিস্-এর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক কর্নেল শেখ মাসুদ আহমেদ স্বাগত বক্তব্য দেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শ্রিংলা । এতে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত্ নিয়ে আলোকপাত করেন। এছাড়া এনআরসি, সিএএ, সীমান্ত ইস্যু, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও ভিসা ইস্যুতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। শ্রিংলা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা এই সফরের প্রত্যাশায় রয়েছি। কারণ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সম্পর্কের প্রতি অগ্রাধিকার দেন এবং এর চেয়েও বড়ো কারণ, বঙ্গবন্ধু একজন বিশ্বনন্দিত নেতা এবং বাংলাদেশ ও আমাদের উপমহাদেশের মুক্তির প্রতীক। ভারতে তার নাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরও জাতীয় বীর। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যৌথ প্রযোজনায় বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাণসহ জন্মশতবর্ষের বিভিন্ন আয়োজনের অংশীদার হতে পেরে আমরা গর্বিত।
শ্রিংলা আরো বলেন, সিএএ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। এটি মানবিক কারণে করা হয়েছে। যেসব উদ্বাস্তু তাদের দেশ থেকে রাজনৈতিক বা অন্য কারণে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভারতে পালিয়ে এসেছে, তাদের দ্রুততার সঙ্গে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য এই আইন করা হয়েছে। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এতে বাংলাদেশের মতো বন্ধুরাষ্ট্রের উদ্বেগের কিছু নেই। প্রতিবেশীর ওপর প্রভাব পড়বে এমন কাজ ভারত করবে না।
অপরদিকে, এনআরসি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নিবন্ধন শুধু আসামে হচ্ছে এবং কোর্টের আদেশে এটি সমাধান করা হচ্ছে। এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে যারা জায়গা পাননি তারা ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবেন।
তিনি বলেন, সিএএ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয় বা ভারতের কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে নয়। সংসদে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা একাধিকবার বলেছেন, এই বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ওপর প্রযোজ্য নয়। এটি প্রযোজ্য ছিল তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় যখন সামরিক সরকার ছিল এবং সরকার বাংলাদেশের সংবিধানের সেক্যুলার বিধান মেনে চলেনি। ফলে সংখ্যালঘুদের একটি অংশ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
শ্রিংলা বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে—সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনা। কারণ, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কে বারবার এসেছে। সীমান্তে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড একটি সমস্যাপূর্ণ বিষয়। এজন্য আমরা সত্যিকার অর্থে দুঃখ প্রকাশ করছি। তিস্তা পানি চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে ভারত এখনো সরে যায়নি। ভারতের ফেডারেল সিস্টেম অনুযায়ী যেসব রাজ্যের সঙ্গে যৌথ নদী রয়েছে তাদের সঙ্গে একমত হয়ে এ ধরনের চুক্তি করতে হয়। আমি আশ্বস্ত করতে চাই আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। এছাড়া অভিন্ন অন্য নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে আলোচনা করছি। যাতে করে উভয় দেশের মানুষ উপকৃত হয়।
ভিসার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে ছিল পাঁচ লাখ। এখন আমরা বছরে ১৬ লাখ ভিসা দিচ্ছি। এ ছোটো সংখ্যা নয়। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ভিসা সিস্টেম চালাই। আমরা চেষ্টা করছি, আরো নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে আরো ভালো সেবা দেওয়ার জন্য। আমরা মাল্টিপল ভিসা দিচ্ছি। এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে পর্যটক ভিসা নিয়েও মেডিক্যাল চেক আপ করা যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ৭৫টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় কমিটি আছে, যার মাধ্যমে দুই দেশের সরকার একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। ঐ সময়ে কংগ্রেস সরকার ছিল এবং এখন বিজেপি সরকার। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এনআরসি, সিএএ নিয়ে তিনি বলেন, ভারত গত তিন-চার বছর ধরে আমাদের আশ্বস্ত করেছে এগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা বারবার বলেছে, এগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।