ভোট-রঙ্গ এবং নির্বাচনে জেতার লাগসই পদ্ধতি

ভোট দেবার জন্য প্রথমেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং অফিসারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করুন। পোলিং অফিসার আপনার বুড়ো আঙুলে অমোচনীয় কালির দাগ দেবেন, তারপর গোপন কক্ষে প্রবেশ করে আপনার পছন্দের প্রার্থীর ঘরে সিল দিয়ে ভোট প্রয়োগ করবেন।

তারপর ব্যালট পেপারটি প্রথমে লম্বালম্বি ও পরে আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করুন। এরপর বাইরে এসে প্রিজাইডিং অফিসারের সামনে রাখা ব্যালট বাক্সে আপনার ভোট প্রয়োগ করুন। মনে রাখবেন ভোট আপনার অধিকার।

এক সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ রকম একটা বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো। এখন তেমন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় না। এর দরকারও হয় না। এখন ভোটাররা অনেক চালাক হয়েছেন, সচেতনও হয়েছেন। এখন তারা নিজ দায়িত্বেই জেনে নেন ভোট প্রদানের নিয়মাবলি। অথবা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভোট প্রদানের গুরুত্ব ও ভোট দেওয়ার নিয়ম জানানোটা এখন আর প্রায়োরিটির মধ্যে নেই। বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থক ভোটাররা এখন হয়তো এমনি এমনি ভোটকেন্দ্রে যান এবং সব কিছু জেনে-বুঝেই ভোট দেন!

যাহোক, অনেক নাটকীয়তা, দরকষাকষি শেষে, কৌশলের খেলা সাঙ্গ করে শরিকদের সঙ্গে নিয়ে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজ নিজ জোটসহ ভোটের রেলগাড়িতে চড়ে বসেছে। ইশতেহার ঘোষণাও শেষ হয়েছে। এখন চলছে ক্ষণ গণনা। ইশতেহারে সব দল এবং জোটই অনেক ভালো ভালো কথা বলেছে। সচেতন ভোটাররা মিলিয়ে দেখছেন এসব প্রতিশ্রুতি। আমাদের দেশের ভোটাররা কিন্তু আসলেই দিন দিন সচেতন হচ্ছেন। তারা ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে এসে, তার অমোচনীয় কালি মুছে যাওয়া মাত্র তার অধিকারের কথা ভুলে যান না এক রত্তিও। তারা মিলিয়ে দেখেন ইশতেহারের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক দলের আচরণ। নির্বাচনের আগে সব দলই আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করে থাকে। কোনো দল এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করে ইশতেহার দেয়, আবার কোনো দল কেবল ঘোষণার স্বার্থেই একটি ইশতেহার ঘোষণা করে।

ক্ষমতাসীন দল বরাবরই তাদের চলমান উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে স্বপ্নের দিগন্তটা অফুরানে টেনে নিয়ে যায়। ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে বিরোধী দল তাদের ইশতেহারে আকাশ-কুসুম অনেক স্বপ্ন যোগ করে দেয়। দৃশ্যমান অবকাঠামোর স্বপ্নগুলোই সাধারণভাবে যুক্ত হয়ে থাকে। সঙ্গে শিক্ষা, কৃষি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা যুক্ত হয় ঐতিহ্যগতভাবে। অধুনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও যোগ হচ্ছে। দেশের সাধারণ ভোটারদের চাহিদাপত্র কিন্তু খুবই সাধারণ। তারা চান নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে এবং ঘরে ফিরতে। শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কোনো গবেষণার গিনিপিগ হবে না তাদের সন্তানরা। নকল ও প্রশ্নফাঁসমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। বেকারদের কাজের সুযোগ। ফুটপাতে স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটে যেতে পারা। রাজধানীসহ সারাদেশে সুষম গণপরিবহন। স্থিতিশীল বাজার। কৃষক তার পণ্যের সঠিক দাম পাবেন। নিশ্চিত স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা তো আছেই। এই সকল চাহিদা পূরণের জন্য সরকারের আর্থিক বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন ‘ইচ্ছে’র বিনিয়োগ। সুশাসন ও সু-তদারকি। এসব কে আনতে পারবে? নাকি সবাই ‘কাজের সময় কাজি কাজ ফুলোলেই পাজি’তে পরিণত হবে? এসব নিয়েও রাজনীতির মাঠ এখন সরগরম।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবারের শীতকে পরাজিত করে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নানা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব হতাশা-উত্তেজনা ছাপিয়ে পুরো দেশে চলছে সাজ-সাজ রব। সবাই ব্যস্ত প্রচারণায়। সারাদেশে সবগুলো মাইক যেন একসঙ্গে বেজে উঠেছে। কেবলই স্লোগান, কেবলই মিছিল আর প্রার্থীদের মার্কার পক্ষে ভোট চাওয়া। বসে নেই প্রার্থী ও সমর্থকরা। শীতের সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি চলছে চায়ের কাপে ভোটের ঝড়। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে সমর্থকরা কথার ঝড়ে শীতকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না। সে সঙ্গে চলছে রসাত্মক সব মত-মন্তব্য।

যেমন এক সময় আমাদের দেশে জালভোট দেওয়া নিয়ে অনেক কৌতুক সৃষ্টি হয়েছিল। তেমন একটি কৌতুক : দুই ভোটার কথা বলছে—

প্রথম ভোটার: গেছিলাম ভোট দিতে, দিতে পারলাম না। কে জানি আগেই আমার ভোটটা দিয়া গেছে।

দ্বিতীয় ভোটার: তাতে কী! আমারটাও কে জানি দিয়া গেছিল, আমি আরেকজনেরটা দিয়া আসছি।

প্রথম ভোটার: আমারে কি বেকুব ভাবছস? আমিও একই কাজ করছি!

জালভোট নিয়ে অনেক সরস গল্পের পাশাপাশি কিছু মর্মস্পর্শী গল্পও চালু আছে। তেমন একটি গল্প।

এলাকার এক প্রবীণ ভদ্রলোক ভোট কেন্দ্রে গেছেন। ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তিনি পোলিং এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলেন, “বেটা তোমার চাচি কি ভোট দিয়ে চলে গেছেন?”

পোলিং এজেন্ট লিস্ট চেক করে বললো, “হ্যাঁ চাচা। চাচি ভোট দিয়ে চলে গেছেন।”

তখন চাচা গভীর দুঃখের সঙ্গে বললেন, “ইস যদি আরেকটু আগে আসতাম তবে দেখা হতো।’’

পোলিং এজেন্ট অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন চাচা? চাচি কি আপনার সঙ্গে থাকেন না?’’

চাচা বলেলন, “বেটা আজ ১৫ বছর হয়ে গেছে, তোমার চাচি মারা গেছেন। কিন্তু প্রতিবছর ভোটের সময় এসে ভোট দিয়ে চলে যান কিন্তু কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হয় না!”

ভোটের প্রচার কৌশল নিয়েও নানা কৌতুক চালু আছে। যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই সমর্থকের মধ্যে কথা হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের সমর্থক বলছে, আমি যখন কোনো রিকশা বা ট্যাক্সিতে চড়ি তখন চালকের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করি। প্রথমে তার ছেলে-মেয়ের খোঁজখবর নেই, তাকে মোটা বকশিস দেই এবং নামার সময় বলি, আওয়ামী লীগকে ভোট দিও। আওয়ামী সমর্থকের কথা শেষ হলে হাসি দিয়ে বিএনপি সমর্থক বলেন, আমি রিকশা কিংবা ট্যাক্সিতে উঠেই ড্রাইভারকে গালি দিতে শুরু করে দেই। সিগারেট ধরিয়ে তার মুখে ধোঁয়া ছেড়ে দেই, এক টাকাও টিপস দেই না। তবে নামার সময় তোমার মতই বলি— আওয়ামী লীগকে ভোট দিও!

আসলে নির্বাচনে সবাই জিততে চায়। জেতার জন্য নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চায়। কিন্তু নির্বাচনে জেতার আসল এবং একমাত্র লাগসই পদ্ধতি হচ্ছে, ভোটারের মন পাওয়া। এজন্য দল, প্রার্থী, তাদের সমর্থক, জনকল্যাণে ভূমিকা, প্রতিশ্রুতি, কার্যক্রম— সব কিছুই ভালো হতে হয়। সব কিছু দিয়েই ভোটারদের মন জয় করতে হয়। তা না হলে সব উদ্যোগ ও কৌশলই ব্যর্থ হতে পারে।

পরিশেষে একটি গল্প।

এক বেড়াল শেয়ালকে বলছিল কীভাবে কুকুরদের কাছ থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।

“আমি কুকুরদের মোটেই ভয় পাই না।” বলল বেড়াল, “কেননা আমার একটা কৌশল জানা আছে।”

আর শেয়াল বলল, “মাত্র একটা কৌশলের সাহায্যে কীভাবে তুমি কুকুরদের হাত এড়াও? আমার জানা আছে এমন সাতাত্তরটি কৌশল।”

যখন তারা কথাবার্তা বলছিল, সেই সময় একদল শিকারি তাদের কুকুর নিয়ে সেই পথে যাচ্ছিল। বেড়াল তার জানা একটিমাত্র উপায়ই ব্যবহার করল। সে একটি গাছে চড়ে বসল আর কুকুরেরা তার নাগাল পেল না।

আর শেয়াল তার জানা সবগুলো উপায়কেই কাজে লাগাতে চেষ্টা করল কিন্তু কোনোটাই তার কাজে এল না এবং কুকুরেরা তাকে ধরে ফেলল!

কাজেই ভোটে জেতার জন্য কার্যকর একটি পদ্ধতিই যথেষ্ট!

n লেখক : রম্যরচয়িতা