একযুগ পর শিকলমুক্ত হলেন হাবিবুন

টিনের তৈরি একচালা খোলা ঘর। চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কাছেই বড় ভাইয়ের পাকাঘর। কিন্তু ভাইয়ের ঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি। তাকে শিকল-দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল খোলা ঘরটিতে। সেখানে তিনি রোদে পুড়েছেন। বৃষ্টিতে ভিজেছেন। শীতে কষ্ট করেছেন। খেয়ে না খেয়ে থেকেছেন দিনের পর দিন। স্বামী-সন্তান সবাই থাকলেও কেউই খোঁজ নেয়নি তার। এভাবেই শিকলবন্দী অবস্থায় তার জীবন থেকে কেটে গেছে ১২টি বছর। স্বজনের অযত্ন আর অবহেলায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন।

মানসিক ভারসাম্যহীন হতভাগ্য ওই নারীর নাম হাবিবুন নেছা (৫৮)। তার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তার একটানা প্রায় একযুগ ধরে শিকল বন্দিজীবনের অবসান হয়েছে। স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে বড়লেখা থানার ওসি মো. ইয়াছিনুল হক তাকে শিকলমুক্ত করেছেন। এরপর তাঁকে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। নেন চিকিৎসার দায়িত্ব।

আরও পড়ুন: একসাথে তিন সন্তানের জন্ম দিলেন গৃহবধূ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাবিবুন নেছা বড়লেখা সদর ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামের মুহিবুর রহমানে স্ত্রী। স্বামী সংসারে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বিয়ের প্রায় ৭-৮ বছর পর হঠাৎ হাবিবুনের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এরপর স্বামী মুহিবুর রহমান আরেক বিয়ে করে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আলাদা সংসার শুরু করেন। এ অবস্থায় স্বামী সংসারে বেশ কয়েক বছর অযত্ন আর অবহেলায় ছিলেন। ছেলে-মেয়েরাও কোনো খবর নেয়নি। এ অবস্থায় আনুমানিক ১৪ বছর আগে হাবিবুন নেছাকে বাড়ি নিয়ে যান বড়ভাই ইসলাম উদ্দিন। সেখানে তার দেখাশোনা করেন। বছর দেড়েক ভালো ছিলেন। আবার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এরপর অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন তিনি। এরপর শিকল ও দঁড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। দীর্ঘদিন এভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও খোঁজ নেননি স্বামী। এমনকি নাড়ী ছেড়া ধন ছেলে-মেয়ে বড় হলেও কোনো খবর রাখেনি মায়ের। খোলা ঘরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজেই পার হয়েছে তার একযুগ। মানসিক ভারসাম্যহীন থাকায় তার কষ্টের, যন্ত্রণার এই কথাগুলো কাউকে বলতে পারেননি।

মঙ্গলবার দুপুরে স্থানীয়ভাবে খবর পান বড়লেখা থানার ওসি। এরপর উদ্ধার করেন শিকলবন্দী হাবিবুন নেছাকে। ওই বাড়িতে তাকে গোসল করান। দেন খাবার। খাবার শেষে নিয়ে আসেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে নিজ দায়িত্বে ভর্তি করান। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফলমূল কিনে দেন। দেখা শোনার জন্য ২জন নারী পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব দেন। হাবিবুন নেছার চিকিৎসা চলছে।

আরও পড়ুন: করোনা আতঙ্কে হোলি না করার ঘোষণা ভারত রাষ্ট্রপতির

হাবিবুন নেছার বড় ভাই ইসলাম উদ্দিন বলেন, বিয়ের ৭-৮ বছরের মধ্যেই ছোট বোনের মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন। কিন্তু তিনি সুস্থ হননি। স্বামী ও ছেলে-মেয়েরা খোঁজ-খবর নেয় না। ভাগ্নে নাজিম উদ্দিন ও আলা উদ্দিন বিয়ে-সাদি করেছে। তাদের ফার্নিচারের ব্যবসা রয়েছে। তারা মায়ের কোনো খোঁজই রাখে না। খুলে দিলে মানুষকে মারধর করেন। উধাও হয়ে যান। এজন্য এভাবে বেঁধে রেখেছেন।

বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক বলেন, ‘ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে আমরা শুনেছি। এরপর সেখানে দ্রুত যাই। গিয়ে দেখি এক এক চালা খোলা একটি ঘরে হাবিবুন নেছাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। একজন মানুষকে প্রায় ১২ বছর ধরে নোংরা স্থানে এভাবে বেধে রাখা অত্যন্ত অমানবিক। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার হাসপাতালে ভর্তি করেছি। তার চিকিৎসার সব দায়-দায়িত্ব নিয়েছি। দেখে তো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তার স্বামী-সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইত্তেফাক/বিএএফ