ঋতু

আমার শৈশবের বসন্ত

গ্রামের দক্ষিণের হৈলাজলায় টগর ফুলগুলো ফুটতে শুরু করলেই আমরা বুঝতে পারতাম শীত বিদায় নিতে আর দেরি নেই। তখনো কুয়াশা জমে থাকত কচুরিপানায়। কলমিলতাগুলো সতেজ স্ফূর্তিতে মেতে থাকত ভোরের শিশিরের সান্নিধ্যে। হেলেঞ্চা আর কলমি ফুল দৃশ্যের বাইরে থাকে, এদের খুব কাছে এগিয়ে দেখতে হয়। এ বসন্তদিনে মামাবাড়ি কিংবা খালাবাড়ি বেড়াতে গেলেই দেখতাম লেবুগাছে সাদা ফুল আসছে; কাগজিলেবুর পাতা কচলিয়ে শরবত তৈরি করা যায়! স্বাদটা একেবারেই লেবুর শরবতের মতো।

গাদা আর হাসনাহেনা শীতের ফুল। শীতের রাতে এমন অনেক দিন পথ চলতে গিয়ে থেমে গেছি হাসনাহেনার গন্ধে। কোথাও হাসনাহেনার গন্ধ ছড়াচ্ছে রাতে,—আমার নাকে প্রবেশ করতেই থমকে দাঁড়িয়েছি। এভাবে খেজুর রসের দিন হারিয়ে মাঠে-ঘাটে চৌদিকে ফুল ফুটে বসন্তের আগমন ঘটত। আমের বউলও শীতের শেষদিকে বসন্তের বার্তা নিয়ে আসত।

শৈশবে খেলার সরঞ্জাম ছিল নারকেলের খোলা, পীতবর্ণের ফেনা ফুল, সেইসঙ্গে শৈন্যলতা, আতা আর নানা প্রজাতির লতানো গাছ। সকালবেলা খাওয়ার কথাও ভুলে যেতাম। মাদ্রাসার মৌলভীর বেত্রাঘাতে পিঠ লাল হয়ে যেত। বসন্তের ফুল-লতাগুল্ম নিয়ে খেলায় মেতে উঠে সেই বেত্রাঘাতের কথা ভুলতাম। আমাদের অবশ্য একটু কম পেটাতেন মোল্লা ভাই। মোল্লা ভাইয়ের ছেলে আবু বক্কর কাকা বেশি মারতেন। আমি প্রায়ই মক্তব ফাঁকি দিতাম। আর বসন্তকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রেকর্ড আমার নেই। এ কাল তো ঘুরে বেড়ানো, ঘুড়ি ওড়ানো, খেলার কাল। খেলা না থাকলে নতুন করে খেলায় আয়োজন করতাম। খেলার আয়োজন ফুরিয়ে গেলে পুকুরে ‘একি-লাই’ খেলতাম ডুবিয়ে ডুবিয়ে। চোখ লাল-রক্তিম হয়ে উঠত। জেঠা এসে পুকুরপাড় থেকে আতাগাছের ডাল ভেঙে শাসন করার প্রস্তুতি নিতেন। তখন পুকুরের অন্যপ্রান্তে সাঁতরে পালাতাম।

বসন্তে পুকুরের জল শুকিয়ে পাড়ের নিচের অংশের মাটি দেখা দিত। পুকুরের দুপাশে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলে থাকত শিয়াল, বাঘ, বনবিড়াল, বাগদাশসহ নানা প্রজাতির মাংসাশি প্রাণী। পুকুরপাড়ে যখন হাঁসের দল দুপুরবেলায় শুয়ে বিশ্রাম নিত, সে সময় জঙ্গলের প্রাণীরা হাঁসদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। হাঁসের চিত্কার শুনে ঘাটে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা দেখতেন যে একটি হাঁস মুখে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে কোনো বাগদাশ বা শিয়াল। মামাবাড়ির চারপাশ বন-জঙ্গলে ঘেরা। পাশেই লালমাই পাহাড়। ময়নামতি আমার মামাবাড়ি। সেই বাড়ির চারপাশে বসন্তকালে ফুলের হাট বসে যেন—যেদিকে তাকাই চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল। ভোর থেকেই দোয়েলের শিস শুরু হয়, এই শিস দিনের যে কোনো সময় কানে আসে। ঘুঘুর ডাক মধ্যদুপুরে এত বিহ্বল করে তুলত যে তখন শিশুদের মতো কৌতূহলী হয়ে সেই স্বর-সুর শুনতাম। ঘুঘু ডাক থামাতে চাইত না—শুধু ডেকেই যেত।

খালাদের বাড়ির পশ্চিমে ছিল খিল। আমি আজো জানি না জঙ্গলকে কেন ‘খিল’ বলা হয়। সেই খিলে আমি যেতাম ফুল তুলতে। খালাত ভাইবোনেরা যখন সকালবেলা মাস্টারের ঘরে পড়ায় ব্যস্ত, আমি তখন কুয়াচ্ছন্ন খিলে শিশিরবিন্দু ফুল তুলে নিয়ে এসে একা একা খেলার আয়োজন করতাম। নিজের সঙ্গে নিজের খেলা—কী চমত্কার ছিল! তখন পলাশগাছে এসে বসত শালিক। হলদে পাখিরাও উড়ে এসে বসত পুকুরপাড়ের সোনালু নিম কড়ই হিজল শ্যাওড়া গাছে।