শেরপুর প্রতিনিধি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শেরপুর জেলার ৩টি সংসদীয় আসনে প্রচারণা এখন তুঙ্গে। যদিও এ প্রচারণায় নৌকা প্রতীকধারীরা যতটা সোচ্চার তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ধানের শীষের প্রচার তেমনি অনেকটাই নীরবে-নিভৃতে চলছে। জেলা ও উপজেলার শহরগুলো নৌকার পোস্টারে ছেয়ে গেলেও ধানের শীষ প্রতীকের পোস্টার প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। অবশ্য গ্রামে-গঞ্জে এ চিত্র উল্টো। সেখানে সবদলের পোস্টারই দৃশ্যমান। গড়ে উঠেছে নির্বাচনী কেন্দ্র। দলীয় মনোনয়ন প্রার্থীরা এখন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করে ফিরছেন। পথসভায়, উঠোন বৈঠকে দলের ইস্তেহার তুলে ধরছেন। নির্বাচিত হলে এলাকাবাসীদের জন্য কি করবেন তার ফিরিস্তি দিয়ে ভোটারদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেলার ৩টি আসনই বর্তমানে আওয়ামী লীগের করায়ত্ত। তারা এই আসন ৩টি ধরে রাখার ব্যাপারে যেমন সচেষ্ট তেমনি আত্মবিশ্বাসী। অপরদিকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় মিথ্যা গায়েবি মামলা দেওয়া সত্ত্বেও গ্রেফতার আতঙ্ক এড়িয়ে বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা ভোটের মাঠে সক্রিয়। বিজয় ছিনিয়ে আনতে প্রাণপাত করে চেষ্টা চলিয়ে যাচ্ছেন।
শেরপুর-১ সদর আসনে নৌকা প্রতীকে লড়ছেন পর পর ৪বার নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় হুইপ আতিউর রহমান আতিক। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের সানসিলা জেবরিন। রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অপরিচিত মুখ। তার পিতা হযরত আলী জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে তিনি কারাগারে। নির্বাচনে তিনিও মনোনয়ন প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু ঋণ খেলাপীর কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় তার মেয়ে সানসিলা প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু বদলী প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও জেলা শহরে ধানের শীষের প্রচার-প্রচারণা নেই বললেই চলে। পোস্টারও চোখে পড়ে না। তবে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিএনপি প্রার্থী কারারুদ্ধ তার পিতার মুক্তিতে সাহায্য করার জন্য ধানের শীষের অনুকূলে ভোট চাইছেন। তার আকুল আবেদন অনেক ভোটারের মন ছুঁয়ে গেছে।
জেলা আওয়ামী লীগের ১টি বিদ্রোহী গ্রুপ যারা পশ্চিমাঞ্চল গ্রুপ বলে পরিচিত তারা সকল মান-অভিমান ও মনোনয়ন না পাওয়ার মনোবেদনা ভুলে নৌকার পক্ষে নাির্বচনী প্রচারণায় সামিল হয়েছে। এর ফলে নৌকার পালে নতুন হাওয়া যোগ হয়েছে। এ আসনে আরো তিনজন প্রার্থী রয়েছেন। তারা হচ্ছেন সিপিবি’র আফিল শেখ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের অ্যাড. মতিউর রহমান ও লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টির আলহাজ ইলিয়াসউদ্দিন। অবশ্য জাতীয় পার্টির প্রার্থী গত শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে তার নিষ্ক্রিয়তার ঘোষণা দিয়েছেন।
শেরপুর-২ নকলা-নালিতাবাড়ি আসনে প্রার্থীর সংখ্যা তিন। এদের মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় নৌকা প্রতীকে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী খুবই সক্রিয়। তাঁর মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে তিনি সফলতার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও তিনি একজন সাধারণ প্রার্থীর মতো গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। সর্বত্রই তিনি সাড়া পাচ্ছেন। বিশেষত মহিলা ভোটারদের মধ্যে তার ঈর্ষণীয় আস্থা লক্ষণীয়। অপরদিকে বিএনপি’র প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণা অনেকটাই নীরবে-নিভৃতে চলছে। তার অভিযোগ পুলিশ তার দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট মামলা দিয়ে তাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে। এরপরও তার দল বসে নেই। গ্রেফতার হামলা বাঁচিয়ে তারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফাহিম চৌধুরীর আশা ২০০১-এর নির্বাচনে তার পিতা মরহুম জাহেদ আলী চৌধুরী এ আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। ভোটারগণ নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারলে এবং ভোট দিতে পারলে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে তিনি মনে করেন। এ আসনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী নূরুল ইসলাম। তার প্রচার-প্রচারণা দৃশ্যমান নয়।
শেরপুর-৩ শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র প্রার্থী আপন চাচা-ভাতিজা। নৌকা প্রতীকে চাচা ফজলুল হক চাঁন এবং ধানের শীষ প্রতীকে ভাতিজা মাহমুদুল হক রুবেল। এ আসনে আরও দু’জন প্রার্থী রয়েছেন। তারা হচ্ছেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আব্দুস সাত্তার ও লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের বাদল। এ আসনে মোট ৪ জন প্রার্থী হলেও মূলত নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যেই লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে এলাকার ভোটারদের অভিমত। বিএনপি’র প্রার্থীর মূল অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশ তার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে তফসিল ঘোষণার আগে ১৯টি এবং তফসিল ঘোষণার পরে ২১টি মিথ্যা, বানোয়াট ও গায়েবি মামলা দিয়েছে।
গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন তাদের পিছনে ছায়ার মতো লেগে আছে। গ্রেফতারের ভয়ে তার নেতা-কর্মীরা মাঠে নামতে পারছেন না। তিনি গুম ও প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রকাশ করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছেন। এরপরও যত বাধা-বিপত্তি আসুক ভোটের শেষদিন পর্যন্ত তারা নির্বাচনের মাঠে থাকবেন। অপরদিকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ফজলুল হক চাঁনও তার প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রকাশ করে পাল্টা সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন।
এ ব্যাপারে নৌকার প্রার্থীর বক্তব্য এ আসনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী যেখানে অবাধে তার প্রচারকার্য চালিয়ে যাচ্ছেন সেখানে বিএনপি প্রার্থীর বাধা কোথায়?