আজ সাতই মার্চ। বাঙালি জাতির এক আবেগঘন দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে ক্ষুরধার, নান্দনিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন যেই বক্তব্য তিনি রাখিয়াছিলেন, তাহা কেবল বাংলাদেশের নহে, পৃথিবীর সকল মুক্তকামী মানুষের জন্য বার্তা হইয়া রহিয়াছে। দিন যত গড়াইয়াছে, এই ভাষণের তাত্পর্য ও ঐতিহাসিক মূল্য ততই বাড়িয়াছে; অনুধাবন করিতে পারিয়াছেন বিশ্বনেতৃবৃন্দও। সেই কারণেই ২০১৭ সালে ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদত্ত এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল বলিয়া স্বীকৃতি দিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে, এই ভাষণই বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে এক নয়া তিলক রচনা করিয়া দিয়াছিল। এই ভাষণই ছিল মুক্তির ডাক। আজও এই ভাষণ শ্রবণে বাঙালির রক্তে জেগে উঠে অন্যায়, অবিচার আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার অগ্নিকণা; আজও এই ভাষণের স্পৃহায় আকাশের দিকে উঠিয়া যাইতে চায় আজকের তরুণের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত।
কী ছিল সেই ভাষণে? কেন মুক্তিকামী মানুষ উদ্বেলিত হইয়া উঠিয়াছিল; স্বাধীনতার তৃষ্ণায় উঠিয়াছিল বান? কেন ১৭৭৫ সালের ২৩ মার্চ প্যাট্রিক হেনরির ভার্জিনিয়া কনভেনশনে দেওয়া গিভ মি লিবার্টি, অর গিভ মি ডেথ, ১৮৬৩ সালে আব্রাহাম লিংকনের দেওয়া গেটিসবার্গের ভাষণ, ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের দেওয়া আই হ্যাভ এ ড্রিম ভাষণের চাহিতেও অধিক আবেদনময়ী এবং তাত্পর্যপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ? কেবল এই ভাষণের পরই বাঙালি মৃত্যুর মুখে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল তাহাই নহে, এই ভাষণের ছিল একটি নান্দনিক দিক। তিনি লিখিত ভাষণ প্রদান করেন নাই। চারিদিকে জনস্রোতের দিকে তাকাইয়া মাইকের মাউথপিসের সামনে দাঁড়াইয়া পোডিয়ামের উপর চশমাটি রাখিয়া তিনি তার জাতিকে ডাকিয়া উঠিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার!’ প্রায় ১৯ মিনিটের সেই ভাষণে তাহার অঙ্গভঙ্গি, তাহার মুখের অভিব্যক্তি, তাহার কণ্ঠ মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া তুলিয়াছিল। আজ যাহারা পথভ্রষ্ট হইয়াছেন, যাহারা রাজাকারদের সঙ্গে হাত মিলাইয়াছেন, তাহারাও এই ভাষণে ছিলেন উদ্বুদ্ধ। ভাষণের শুরুতেই তিনি ন্যায্যতা প্রতিপাদন করিলেন। ইহার পর তিনি জানাইলেন ২৩ বত্সরে বাংলার মানুষের রক্তে রঞ্জিত হইবার ইতিহাসের কথা। একে একে জানাইলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর শাসনতন্ত্র উপেক্ষার কথা, নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করিয়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইবার কথা। ইহার পরই তিনি তুলিয়া ধরিলেন তাহার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বের কথা। তাহার পর চিত্কার করিয়া জানাইয়া দিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না! এই দেশের মানুষের অধিকার চাই!’ আর এই অধিকার অর্জনে তিনি কী করিবেন, জাতিকে কী করিতে হইবে তাহার দিকনির্দেশনা দিলেন। পরিষ্কার জানাইয়া দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!’
এই যে ভাষণটির ধারাবাহিকতা, উহা ছিল যেন দেশ স্বাধীনের এক মহাসংগীতের স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারি। কেবল বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের যে স্পিরিট, তাহা মনে রাখিলে, তাহা অনুসরণ করিলে এই দেশের মানুষ পথহারা হইবে না, ইহা আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।