গ্লুকোমা রোগে যা করণীয়

অধ্যাপক ডা. ইফতেখার মো. মুনির

অন্ধত্ব একটি অভিশাপ। গ্লুকোমাজনিত অন্ধত্বের কোনো প্রতিকার নেই, প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। সারা বিশ্বে প্রায় ৮০ মিলিয়ন লোক অন্ধ। গ্লুকোমাজনিত অন্ধ লোকের সংখ্যা প্রায় ৮ মিলিয়ন। এর এক বিরাট অংশ রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। গ্লুকোমা রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে এক বিরাট জনগোষ্ঠী অপরিবর্তনযোগ্য অন্ধত্বের শিকার হন যা প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় করতে পারলে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আমাদের দেশে এবং পৃথিবীব্যাপী অন্ধত্বের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো চোখের গ্লুকোমা। অনেক ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণ রোগী বুঝতে পারার আগেই চোখের স্নায়ু অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই রোগে দৃষ্টির পরিসীমা বা ব্যাপ্তি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে এবং কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি অনেকদিন ঠিক থাকে বিধায় রোগী চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে অনেক দেরি করে ফেলেন। গ্লুকোমা  চোখের অনিরাময় যোগ্য অন্ধত্ব তৈরি করে। তাই একবার দৃষ্টি যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।  চোখের গ্লুকোমা রোগ হলে রোগীকে সারাজীবন চিকিত্সকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়। অনেকেই শেষ পর্যন্ত চিকিত্সকের সংস্পর্শে থাকেন না বা ঠিকমতো ওষুধ ব্যবহার করেন না। ফলে এই রোগ নীরবে ক্ষতি করে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়।

অনেক ক্ষেত্রেই রোগী এই রোগের কোনো লক্ষণ অনুধাবন করতে পারেন না। চশমা পরিবর্তনের সময় কিংবা নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষার সময় হঠাত্ করেই চিকিত্সক এই রোগ নির্ণয় করে থাকেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিম্নের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে। যেমন: ১। ঘন ঘন চশমার গ্লাস পরিবর্তন হওয়া। ২। চোখে ঝাপসা দেখা বা আলোর চারপাশে রংধনুর মতো দেখা।  ৩। ঘন ঘন মাথা ব্যথা বা চোখে ব্যথা হওয়া। ৪। দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে কমে আসা বা দৃষ্টির পারিপার্শ্বিক ব্যাপ্তি কমে আসা। অনেক সময় চলতে গিয়ে দরজার পাশে বা অন্য কোনো পথচারীর গায়ে ধাক্কা লাগা। ৫। মৃদু আলোতে কাজ করলে চোখে ব্যথা অনুভূত হওয়া। ৬। ছোটো ছোটো বাচ্চাদের অথবা জন্মের পর চোখের কর্নিয়া ক্রমাগত বড়ো হয়ে যাওয়া বা চোখের কর্নিয়া সাদা হয়ে যাওয়া, চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি।

গ্লুকোমা রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব কিন্তু নিরাময় সম্ভব নয়। ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো এই রোগের চিকিত্সা সারাজীবন করে যেতে হবে। এই রোগে দৃষ্টি যতটুকু হ্রাস পেয়েছে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে দৃষ্টি যাতে আর কমে না যায় তার জন্য আমাদের চিকিত্সা চালিয়ে যেতে হবে।

যেহেতু চোখের উচ্চ চাপ এই রোগের প্রধান কারণ তাই ওষুধের দ্বারা চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। একটি ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে একাধিক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। তদুপরি তিন মাস অন্তর অন্তর চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয়ে এ রোগের নিয়মিত কতগুলো পরীক্ষা করিয়ে দেখতে হবে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না। যেমন : দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, চোখের চাপ পরীক্ষা, দৃষ্টি ব্যাপ্তি বা ভিজ্যুয়াল ফিল্ড পরীক্ষা,  চোখের নার্ভ পরীক্ষা।

ওষুধ ছাড়াও অন্যান্য চিকিত্সা রয়েছে যার সিদ্ধান্ত প্রয়োজনে বা সময়মতো চিকিত্সক গ্রহণ করতে পারেন। যেমন:গ্লুকোমা, লেজার চিকিত্সা এবং শল্য চিকিত্সা যার দ্বারা এই রোগে চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব।

চিকিত্সক রোগীর চক্ষু পরীক্ষা করে তার চোখের চাপের মাত্রা নির্ণয় করে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করে দেবেন তা নিয়মিত ব্যবহার করা। দীর্ঘদিন একটি ওষুধ ব্যবহারে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। তাই নিয়মিত চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া। সময়মতো চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা (যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে) করিয়ে দেখা যে তার গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে আছে কি না। পরিবারের সবার চোখ পরীক্ষা করিয়ে গ্লুকোমা আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া।

সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা। ঠিকমতো ওষুধ ব্যবহার করে এবং চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে একজন গ্লুকোমা রোগী তার স্বাভাবিক দৃষ্টি নিয়ে বাকি জীবনটা সুন্দরভাবে অতিবাহিত করতে পারেন।

চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে আপনার চক্ষু পরীক্ষা করিয়ে চোখের চাপ জেনে নিন। চক্ষু চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয়ে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হোন আপনার বা পরিবারের কারো গ্লুকোমা আছে কি না। গ্লুকোমা প্রতিরোধ করুন, অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকুন। আপনার পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুন্দর দৃষ্টিশক্তি নিয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করুন।

n লেখক : এফসিপিএস (চক্ষু) ফেলো গ্লুকোমা (নয়া দিল্লি), অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, গ্লুকোমা বিভাগ, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল,

শেরে বাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭