আলোকপাত
সৈয়দ ফারুক হোসেন
উদ্ভাবিত প্রতিটি জিনিসেরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক ব্যবহার এবং দিক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মানব সভ্যতার যোগাযোগকে অনেক বেশি সহজতর করলেও এর ক্ষতিকর দিকও কম নয়। আমাদের জাতীয় জীবনে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে যথেষ্ট ভালো ভূমিকা রাখছে—এটি যেমন সত্য, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক সামাজিক সম্পর্ক, সমাজ জীবন ও মননশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে আমাদের জীবনের প্রথম পর্যায়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ফেসবুক।
ফেসবুক যাত্রা শুরু করেছিল ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মার্ক জাকারবার্গ নামের এক যুবক ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। মার্ক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কক্ষে এটি চালু করেছিলেন। এটি কেবল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই সীমিত ছিল। ইন্টারনেটভিত্তিক এই সামাজিক চ্যানেল এত দ্রত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, চালু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি ছাত্রছাত্রী এর সদস্য হয়। আরো কিছু দিনের মধ্যেই কয়েক মিলিয়ন মানুষ ফেসবুকের গ্রাহক তালিকায় যুক্ত হন। এভাবে এ চ্যানেল পারস্পরিক যোগাযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮০০ মিলিয়ন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে। এর ৫০ শতাংশ প্রতিদিন এ সাইটটি ব্যবহার করছে। গড়ে এক জন ফেসবুক ব্যবহারকারীর ১৩০ জন বন্ধু রয়েছে। ফেসবেকার্স ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২২ লাখ ৫২ হাজার ৮শ ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২১৩টি ফেসবুক ব্যবহারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬। ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার পরে ভারতের অবস্থান।
ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক দিন আগের কোনো বন্ধু কিংবা আত্মীয়কে খুঁজে পাওয়া কিংবা নতুন কারো সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, ফেসবুকের মাধ্যমে তথ্যের আদানপ্রদান, খবর পাওয়া ইত্যাদি কিংবা অনেকে ফেসবুকের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রসার করছেন; এসব ইতিবাচক দিক ছাড়াও ফেসবুকের কিছু নেতিবাচক দিক আছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে বেশ আলোচিত ব্যাপার হচ্ছে ফেসবুকে গুজব ও ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি এবং তা কীভাবে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্র্রতিক নির্বাচনে ফেসবুকের ভুয়া খবর বিশেষ প্রভাব রেখেছে। এইসব ভুয়া খবরে জনমত ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। অধিকাংশ ছাত্রসমাজ ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ম্যাসেঞ্জার ইত্যাদি নিয়ে মেতে আছে। পড়াশোনার সময়টা তারা নষ্ট করছে এসবের পেছনে। এমনকি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার পূর্ব রাতে ফেসবুকে ডুবে থাকে। যে মূল্যবান সময়টা তাদের বই, খাতা, কলমের সঙ্গে কাটানো জরুরি, সেই সময়টা তারা ফেসবুকের পেছনে অপচয় করছে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, অবসন্নতা, মনমরা, হওয়াসহ আরো অনেক স্বাস্থ্যগত ক্ষতি করছে এই ফেসবুক ও ইন্টানেট ব্যবস্থা। এছাড়া অনেকে অশ্লীল ও নোংরা ছবি ভিডিও ইত্যাদি দেখে খারাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে। ফেসবুকে চ্যাটিংয়ের কারণে স্বামী স্ত্রীকে আর স্ত্রী স্বামীকে সন্দেহ করছে। নিজেদের মধ্যে কলহ দিন দিন বাড়ছে। এক পরিবারে পাঁচ জন সদস্য থাকলে পারিবারিক কথা আর হয় না, সেখানে দেখা যায় সবাই ফেসবুক নিয়ে বসে আছে। বছরের ৩০ হাজার বিবাহ বিচ্ছেদ হলে এর মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে এই ফেসবুকের কারণে।
n লেখক :ডেপুটি রেজিস্ট্রার,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা