দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, সিলেট থেকে
প্রধান সড়ক থেকে একটা সরু গলি ঢুকে গেছে।
এই গলির মাথায় যে বড়ো একটা স্কুল আছে, সেটা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। গেটের কাছে সাদা পোশাক পরা ছাত্রদের জটলা দেখে বোঝা গেল, সঠিক পথে আছি। তারপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্যই প্রশ্ন করা,
‘এটা কী রাজিন সালেহদের স্কুল?’
কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো এক কিশোর লাফ দিয়ে উঠলো,
‘জ্বি। শুধু রাজিন ভাই না; অলক কাপালি, তাপস বৈশ্য, আবু জায়েদ রাহিও এই স্কুলে পড়েছেন।’
হ্যাঁ, এই স্কুলটাকে বলতে পারেন জাতীয় দলের টুকরো একটা স্মৃতি। বলতে পারেন, সিলেটের খেলোয়াড় তৈরির কারখানা—দি এইডেড হাইস্কুল।
১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এইডেড হাইস্কুল এই নগরীর প্রাচীন একটা বিদ্যালয় হিসেবেই গর্ব করতে পারে। কিন্তু এই স্কুলটির আসল গর্বের জায়গা খেলাধুলা। এই স্কুল থেকে গুনে গুনে চার জন খেলোয়াড় জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলেছেন বা খেলছেন। বাংলাদেশে সম্ভব আর কোনো একক বিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখান থেকে চার জন জাতীয় ক্রিকেটার উঠে এসেছেন। এছাড়া এই স্কুলটির অন্তত জনা তিরিশেক ছাত্র ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ পর্যন্ত পৌঁছেছেন।
শুধু ক্রিকেট নয়; হকি, ভলিবল, হ্যান্ডবলেও এইডেড স্কুলের আছে দারুণ দাপট। এক সময়ের এশিয়া কাঁপানো হকি তারকা জুম্মন লুসাই এবং তার ভাইয়েরা এই স্কুলের ছাত্র। এছাড়া রনজিত্ দাস এবং ক্রীড়াবিদ কর্নেল হামিদ (কায়সার হামিদের বাবা) এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। স্কুলের নিজস্ব হকি, ভলিবল ও হ্যান্ডবল দল অংশ নেয় সিলেটের লিগে।
আমাদের আপাতত আলোচ্য ছিল এই স্কুলের ক্রিকেটের প্রতাপ নিয়ে। নিজের স্কুল সম্পর্কে পরিচয়টা সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক রাজিন সালেহই দিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের সিলেটের অনেক ক্রিকেটারের খেলায় হাতেখড়ি এই স্কুল থেকে। এখানে ক্রিকেটে উত্সাহ পেয়েছি বলেই আমাদের এগিয়ে যাওয়াটা সহজ হয়েছে।’
এইডেড স্কুলের প্রবল প্রতাপ চোখে পড়বে তাদের রেকর্ডে চোখ বোলালেই। এই স্কুলটি নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটে টানা ১৯ বার জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড করেছিল। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে ১৯৯৪ সালে রানার্সআপ হয়েছিল তারা। মূলত আশির দশকের শেষদিকে স্কুলের কয়েক জন শিক্ষক এই স্কুলে খেলাধুলা নিয়ে বেশি আগ্রহী হন। তার প্রভাব পড়ে ছাত্রদের ওপরে।
এইডেড স্কুলের ক্রিকেট, হকি, হ্যান্ডবল সাফল্যের অন্যতম কারিগর হচ্ছেন এই স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক দিপাল কুমার সিংহ। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের এই মানুষটি তার স্থানীয় এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এরপর ১৯৮৮ সালে তিনি ঢাকার শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। তারপরই তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়। তার তত্ত্বাবধানেই মূলত অন্যরকম একটা মাত্রা পায় এই স্কুলের খেলাধুলা।
এইডেড স্কুলের খেলাধুলার সাফল্যের জন্য বড়ো কৃতিত্ব দেওয়া হয় এখানকার সাবেক প্রধান শিক্ষক বিরাজ মাধব চক্রবর্তীকে। তিনি মূলত একজন ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন; জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি ছিলেন। বর্তমান প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শমশের আলী সেই ধারাটা ধরে রেখেছেন। তিনি বলছিলেন, ‘সবগুলো ডিসিপ্লিনে ছেলেদের খেলা চালাতে যে আলাদা ব্যয় হয়, সেটা চালানোর জন্য আমাদের একটা আলাদা ফান্ড আছে। আমরা মনে করি না যে, সকল ছাত্রকে জিপিএ-ফাইভ পেতে হবে। যারা যে বিভাগে ভালো করতে চায়, আমরা তাকে সেই পথে চলার জন্য উত্সাহ দেই।’
দিপাল সিং জানালেন, স্কুলের সব শিক্ষকই খেলাধুলায় ভালো করার জন্য ভূমিকা রাখেন। কারণ, যারা খেলাধুলা করেন, তাদেরকে নিয়মিত ক্লাস থেকে প্রায়শ ছেড়ে দিতে হয়। তাদের এই ক্লাসের বাদ পড়া অংশগুলো শিক্ষকরা বাড়তি কষ্ট করে পুষিয়ে দেন। তবে ইদানিং একটু হলেও খেলাধুলায় ভাটির দিন দেখতে পাচ্ছেন দিপাল সিংহ। তিনি বলছিলেন, ‘আগে একটা খেলার দল করতে গেলে ৩০০-৪০০ ছেলে ট্রায়াল দিতো। এখন ১০০ হয় কি না সন্দেহ। আগ্রহ কেন জানি কমছে। আমি জানি না, ফেসবুক বা অন্য কারণে এসব হচ্ছে কি না। তবে উত্সাহটা কমছে।’
আমরা আশা করি এই ভাটির সময় কেটে যাবে। আবার দলে দলে খেলায় অংশ নেবে ছেলেরা। আবার এখান থেকে বেরিয়ে আসবে নতুন কোনো অলক কাপালি বা তাপস বৈশ্য।