নভেল করোনা ভাইরাসে এখন দিশাহারা বিশ্ব। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে। গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৮৭টির বেশি দেশ। বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এই ভাইরাস। পুঁজিবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। পর্যটন ও বিমানশিল্পে ধস নেমেছে। এই ভাইরাস ছোঁয়াচে-সংক্রামক হওয়ায় সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিতেও এসেছে পরিবর্তন। জুমার নামাজ, জামাতে নামাজ সীমিত হয়ে গেছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওমরাহ ভিসা। পবিত্র কাবা শরিফে রাতের তাওয়াফ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বহু দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সভা-সমাবেশ-জমায়েত স্থগিত করা হচ্ছে। বিশ্বের বড়ো বড়ো ইভেন্ট-কনফারেন্স সীমিত হয়ে পড়েছে।
গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান সিটি থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চীনে কিছুটা কমলেও সংক্রমণ বাড়ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশে। বাড়ছে বিশ্ব জুড়ে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যাও। এ পর্যন্ত প্রাণ গেছে ৩ হাজার ৩৯৪ জনের। কভিড-১৯-এর প্রকোপে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখের বেশি। সর্বাধিক মৃত্যু হয়েছে চীনে; ৩ হাজার ৪৫ জন। সেখানে আক্রান্ত ৮৫ হাজারের বেশি। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬ হাজার ৫৯৩ জন আক্রান্ত হলেও মারা গেছে ৪২ জন। ইতালিতে মারা গেছে ১৪৮ জন, আক্রান্ত ৩ হাজার ৮৫৮ জন। গতকাল এক দিনেই ইতালিতে মারা গেছে ৪১ জন। ইরানে আক্রান্ত ৪ হাজার ৭৪৭ জন, মৃত্যু ১২৪। যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত ২২৮, মৃত্যু ১৫। জাপানে আক্রান্ত ১ হাজার ৪৫ জন, মৃত্যু ১২, ফ্রান্সে আক্রান্ত ৪২৩, গতকাল পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে সাত জনের। এছাড়া সুইজারল্যান্ডেও একজন মারা গেছে।
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে দেশে কোয়ারেন্টাইন, হাসপাতালে পৃথক ইউনিটের পাশাপাশি হ্যান্ডশেক আর জনসমাবেশ নিষিদ্ধের মতো নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বের অনেক এয়ারলাইনসের মতো ব্রিটিশ বিমান সংস্থা ফ্লাইবি বিরাট লোকসানে পড়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যেই ভাইরাস নির্মূল, চিকিত্সা-গবেষণার জন্য ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা করেছে বিশ্বব্যাংক।
নোভেল করোনা ভাইরাসের কারণে অলিম্পিকের ভবিষ্যত্ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্ব জুড়ে মুসলিমদের প্রার্থনায় করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে। সম্প্রতি বিদেশিদের জন্য ওমরাহ হজ নিষিদ্ধ করে সৌদি আরব সরকার। এখন রাতে কাবাঘর তাওয়াফও বন্ধ রেখেছে। ইরান সরকারও সব প্রাদেশিক রাজধানীতে জুমার নামাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাজিকিস্তানে ঘরেই নামাজ পড়ছেন মুসলিমরা। শুক্রবারের জুমার নামাজ স্থগিত করেছে তাজিকিস্তানও। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শরিয়াহ কাউন্সিল ফতোয়া জারি করে বলেছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা এমন আশঙ্কায় যারা রয়েছেন তাদের নামাজ আদায়ে মসজিদে না আসাই উত্তম। দেশটির রাজধানী আবুধাবির ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক মোচ্ছাফ্ফা বাজার সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গত দুই দশক ধরে চীনের অর্থনীতি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর চীনের পর্যটন অনেকটা অ্যাডভেঞ্চারধর্মী। দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ান, ইউরোপীয় ও আমেরিকান পর্যটকদের ঢল নেমেছিল। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে পর্যটকেরা তাদের ভ্রমণ বাতিল করেছে এবং অনেক দেশ চীনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। থাইল্যান্ড এবার প্রায় ১০৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন থাই বাথ লোকসানের মুখে পড়ছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ পর্যটনশিল্পও হুমকির মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশটির ৪ বিলিয়ন বাণিজ্যিক ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চীনের পর্যটন ক্ষতির কারণে ২০২০ সালের প্রথম চার মাসের বিশ্ব সেবা খাতে আয় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো চীনের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বড়ো ধরনের লোকসানের হিসাব কষছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব পর্যটনশিল্পে বড়ো ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে এশিয়ার প্রায় সবগুলো দেশের শেয়ার বাজারের সূচক কমেছে কয়েকগুণ। ভাইরাসের উত্পত্তিস্থল চীন এর সাংহাই কম্পোজিট সূচক পড়েছে প্রায় ৮ ভাগ এর মতো; যা বিগত বছর অর্থাত্ ২০১৯ এর মধ্যে সর্বনিম্ন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকনোমিক্স এর মতে, এই বছরের বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২.৩%, যা ছিল ৪.২% এর কাছাকাছি। যুক্তরাজ্যের প্রধান পুঁজিবাজার লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জভিত্তিক এফটিএসই ১০০ সূচকটি লেনদেন শেষে কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৬ সালের পর এত দরপতন দেখেনি এই সূচক। সে সময় যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার সিদ্ধান্তের কারণে পুঁজিবাজারে সূচকের ধস নামে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে ডাও জোন্স সূচকও দর হারায় ১ হাজার পয়েন্ট। শতাংশের দিক দিয়ে যা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ দরপতন। আতঙ্কে মিলান স্টক মার্কেটে সূচকের দর কমেছে ৬ শতাংশ।
একদিকে পুঁজিবাজারে দরপতন, অন্যদিকে স্বর্ণের দাম হু হু করে বাড়ছে বিশ্ববাজারে। ৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে আছে স্বর্ণ। রপ্তানি নির্ভর দেশ চীনের অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় পার করছে তেল। বিগত এক মাসে ক্রুড ওয়েলের মূল্য কমেছে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৬ ডলার। এর মূল কারণ হচ্ছে, চীনের উত্পাদনমুখী সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে বিশ্ববাজার থেকে তাদের প্রতিদিনের তেলের চাহিদা কমে গেছে প্রায় ২২ ভাগ। গতকাল বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।
করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে ৬ কোটি মানুষ উজাড় হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার অন্তত তিন মাস আগেই এ ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছিলেন দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের অক্টোবর মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিখ্যাত গবেষণা কেন্দ্র্র ‘জন হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি’ ভবিষ্যদ্বাণী করে জানিয়েছিল, নতুন এক ধরনের করোনা ভাইরাসে লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে।