নাসির সিকদারের কৃষ্ণনগর

সুধীর সাহা

একমুখ দাড়ি-গোঁফের এক যুবক রাস্তাতেই পড়ে থাকতেন। কেউ কিছু দিলে খেতেন, না দিলে না খেয়ে কাটাতেন। রাস্তাতেই ছিল তার শয়নকক্ষ। ভারতের কলকাতার নিকটবর্তী কৃষ্ণনগর গ্রাম। ২৪ পরগনার অধীনে পড়েছে এই গ্রামটি। গ্রামের বাজারের পাশে গাছের নিচে প্রায়ই দেখা যায় এই যুবককে। কে এই যুবক, কোথা থেকে এসেছেন তা কেউ জানে না। নিজের নামটি পর্যন্ত মনে নেই। গ্রামের ছেলেমেয়েরা আসা-যাওয়ার পথে তাকে দেখে। কেউ পাগল মনে করে তেড়ে আসে, কেউ দয়া করে কোনো খাবার দেয়। এভাবে চলছিল যুবকের জীবন। যুবকটি কাউকে বিরক্ত করতেন না, কারো সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াতেন না। কারো কোনো ধারণাই ছিল না এই যুবকের ব্যাপারে। ২০১৩ সালের এক সকালে কৃষ্ণনগর গ্রামে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল এই যুবককে। এমন গ্রামে সাধারণত বাইরের কোনো মানুষ আসে না। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে চেনে-জানে। এমন যখন অবস্থা, তখন এই অজ্ঞাত যুবকের সাহায্যে এগিয়ে আসেন ঐ গ্রামেরই এক যুবক বিশু। তাকে দেখে বিশুর মায়া হয়। বিশু তাকে সেলুনে নিয়ে যান এবং চুল-দাড়ি কাটিয়ে দেন। বিশু তাকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। খেতে দেন এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন। যুবকটির মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। কোথায় ব্যথা পেয়েছেন, কীভাবে ব্যথা পেয়েছেন কিছুই বলতে পারছিলেন না যুবকটি। প্রশ্ন করলে বলতেন, কিছুই মনে করতে পারছি না। বিশু তাকে তার বাড়িতে কিছুদিন রাখেন। কিন্তু শিগিগরই বিশুকে কর্মসূত্রে ভারতের বাইরে যেতে হয়েছিল। তাই তার যাওয়ার সময় যুবকটি আরেক বার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। কিন্তু অসুবিধা হয়নি। যুবকটির সাহায্যে এবার এগিয়ে এলেন ঐ গ্রামের বাসিন্দা অরবিন্দ গিরি। অরবিন্দ গিরির বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে যুবকটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এক সকালে হঠাত্ করেই যুবকটি তার নাম মনে করতে পারলেন—‘আমার নাম নাসির সিকদার। বাড়িতে বাবা-মা রয়েছেন।’ কিন্তু বাড়ি কোথায় তা মনে করতে পারেননি নাসির সিকদার। আশ্রয়দাতা হিন্দু পরিবারটি এবার বুঝতে পারল, আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলিম। কিন্তু তার পরও এই হিন্দু পরিবারটি নাসিরকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। পরম যত্নে লালন-পালন করেছে সাত বছর ধরে। সাত বছর পর ২০২০-এ এসে জানা গেল, নাসির সিকদার ভারতের নাগরিক নন। কারণ তার কাছে ভারতের কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। চেষ্টা চলতে থাকল তার পরিচয় জানার। কিন্তু কাজটি সহজ হলো না। নাসির বারবার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না কোথায় থাকেন তার বাবা-মা। কিন্তু নাসির বুঝতে পারছেন, তার বাবা-মা আছে। আরো একটু চেষ্টা।

ইতিমধ্যে যুবকটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে হ্যাম রেডিও অপারেটরগণ। ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সদস্য দিবস মণ্ডল কৃষ্ণনগরে নাসিরের সন্ধান পান। রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস এবং দিবস মণ্ডল ছুটে যান কৃষ্ণনগর গ্রামের অরবিন্দ গিরির বাড়িতে। জনসেবার অংশ হিসেবে তারা একাধিকবার নাসিরের সঙ্গে কথা বলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে নাসিরের পরিচিত কিছু লোক দুবাই থাকেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব এরপর যোগাযোগ করে দুবাইতে বাঙালি সংগঠনগুলোর সঙ্গে। তারা নাসিরের ছবি পাঠিয়ে দেন দুবাইতে। ছবি ঘুরতে থাকে এক হাত থেকে আরেক হাতে। এক পর্যায়ে ছবির প্রতি দৃষ্টি দেয় বাংলাদেশের কিছু শ্রমিকও। তাদের মধ্যে কয়েক জন যুবক ছবি দেখে চিনতে পারে নাসির সিকদারকে। অলৌকিক কি না জানি না, তবে এভাবেই বাংলাদেশের নাসির সিকদারকে চিহ্নিত করা হয় ভারতের কৃষ্ণনগরে। নাসির বাংলাদেশ থেকে কীভাবে ভারতে গেলেন, কবে গেলেন কিছুই মনে পড়ছে না নাসিরের।

পশ্চিম বাংলার হ্যাম রেডিও অপারেটররা যোগাযোগ করেন বাংলাদেশের হ্যাম অপারেটরের সঙ্গে। ইতিমধ্যে দুবাইতে অবস্থিত বাংলাদেশের কয়েক জন শ্রমিক নিশ্চিত করেন যে, নাসির সিকদারের বাড়ি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায়। নবাবগঞ্জ থেকে যাওয়া শ্রমিকরাই তাকে চিনতে পারেন। অতঃপর বাংলাদেশের হ্যাম অপারেটরগণ খুঁজে বের করেন নবাবগঞ্জের বালুচর গ্রামে নাসিরের বাড়ি। নাসিরের বাবা আফতাব সিকদার জানান, ২০১০ সালে ফুটবল মাঠে মাথায় আঘাত পাওয়ার পরই মানসিক সমস্যা শুরু হয় নাসিরের। নাসির মাঝেমধ্যেই বাড়ি থেকে চলে যেতেন। একবার এভাবে চলে গিয়ে নাসির আর বাড়িতে ফিরে আসেননি। ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সাহায্যে ইতিমধ্যে নাসির ভিডিও কলে কথা বলেছেন তার বাবার সঙ্গে। উভয় পক্ষই নিশ্চিত হয়েছেন, এই নাসিরই নবাবগঞ্জের নাসির সিকদার। নাসির কীভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতের কৃষ্ণনগরে গিয়েছেন তা এখনো মনে করতে পারছেন না।

বাংলাদেশের নবাবগঞ্জের নাসির সিকদারের ভারত সফরের সাত বছর পর এবার তার প্রত্যাবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে রেডিও ক্লাব দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা প্রশাসক মি. পি উলগানাথান জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাহায্য নিয়ে বাড়ি ফেরানোর কাজ চলছে। বাংলাদেশের যুবককে বাংলাদেশে পাঠানোর যাবতীয় ব্যবস্থা তারা করবেন। কিন্তু বাংলাদেশ, নবাবগঞ্জ এখনো হয়তো বিষয়টি জানে না। জানলেও নাসির সিকদারকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে না। বাংলাদেশের কলকাতাস্থ ডেপুটি হাইকমিশন অফিস বিষয়টি আমলে নিয়ে যোগাযোগ করতে পারে ভারতের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার প্রশাসনের সঙ্গে কিংবা ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। বাংলাদেশের নাসির সিকদার সাত বছর পর ফিরে আসতে পারেন তার নিজ গ্রাম বালুচরে, তার নিজ বাড়িতে, তার বাবা-মায়ের কোলে।

কলকাতা বেড়াতে গিয়েছিলাম। পড়ছিলাম স্থানীয় আনন্দবাজার পত্রিকা। সেখানেই দেখলাম নাসিরের খবরটি। ভালো লাগল, অভিভূত হলাম। লুফে নিলাম খবরটি। লিখব বিষয়টি নিয়ে। দুটি বিষয় আমাকে এটা নিয়ে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রথমত, আমার লেখা পড়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি নাসিরকে দেশে ফিরিয়ে আনার তাগিদ অনুভব করে। দ্বিতীয়ত, ভারতের কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা অরবিন্দ গিরিকে আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানানো। নাসির রাস্তায় থাকলেও তার কাছেই ঘর পেয়েছেন, আশ্রয় পেয়েছেন, খাবার পেয়েছেন। এই মহত্ ব্যক্তিটি নাসিরের কাছ থেকে বিনিময়ে কী পেয়েছেন জানি না। তবে তিনি দিয়েছেন অনেক কিছু। নাসির মুসলিম—তা জেনেও হিন্দু পরিবারটি নাসিরের ব্যাপারে ভিন্ন চোখে তাকাতে পারেনি। মানবতার এই জয়গানকে যদি প্রচার না করতে পারতাম, তাহলে আমি বোধ হয় শান্তি পেতাম না। শুধু কি অরবিন্দ গিরি, ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সদস্যবৃন্দ, সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস, দিবস মণ্ডল—তারা তো জয় করে নিয়েছেন মানবতার অশেষ বাণী। স্বপ্রণোদিত হয়ে তারা তার ছবি দুবাই পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশে যোগাযোগ করেছেন, নাসিরকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছেন। মানবতার বাণী এখানে যেন আছড়ে পড়েছে। শ্রদ্ধা জানাই এই মানুষগুলোকে। তারা কেউ বাংলাদেশের মানুষ নন, কিন্তু তারা আমাদের পরম বন্ধু—তারা নাসিরের জীবনদাতা। সাত বছর আশ্রয় দেওয়া, খাদ্যের ব্যবস্থা করা কোনোভাবেই ছোটো কাজ নয়। এই মহান কাজের কান্ডারি কৃষ্ণনগরের অরবিন্দ গিরিকে তাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন। আজও নাসিরের দায়িত্ব তিনি বহন করে চলেছেন।

নাসির ফিরে আসুন তার নিজ ঘরে। প্রচারিত হোক তার জীবনের এমন মহান ইতিহাস। অরবিন্দ গিরিরা এখনো পৃথিবীতে আছে বলেই হয়তো অশুভ বায়ুর মাঝে কোথাও কোথাও শান্তির বাতাস বইছে। নাসিরের বেঁচে থাকা, আশ্রয় পাওয়া আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছে—ব্যক্তিমানুষের মূল্য সবচেয়ে বেশি। জীবন জীবনের জন্য, মানুষ মানুষের জন্য। দেশ-কালভেদ করে মানুষের মূল্যই বড়ো হয়ে দাঁড়ায় এখনো কারো কারো কাছে। 

n লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা